নিজস্ব প্রতিবেদক:

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি আটটি যুদ্ধ বন্ধে ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু সংঘাতগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কয়েকটি ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি বা কূটনৈতিক সমঝোতা হলেও সব সংঘাতের স্থায়ী অবসান হয়নি। আবার তাঁর তালিকায় এমন কিছু বিরোধও রয়েছে, যেগুলোকে সরাসরি যুদ্ধ বলা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাইকে দেওয়ার পর ট্রাম্প নোবেল কমিটির সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, ভারত-পাকিস্তানসহ আটটি সংঘাত বন্ধে ভূমিকা রাখার পরও তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি।

নিউইয়র্কের সিরাকিউজে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে এক নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প পিল্লাইকে নিয়েও কটাক্ষ করেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁর এ বক্তব্য নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে।

তবে সংঘাতগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কয়েকটি ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনৈতিক উদ্যোগের ভূমিকা ছিল। আবার কিছু ক্ষেত্রে সমঝোতা অসম্পূর্ণ, যুদ্ধবিরতি ভঙ্গুর কিংবা সংঘাত এখনো চলমান। ফলে আটটি যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করার দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ভারত-পাকিস্তান: যুদ্ধবিরতি, মধ্যস্থতা নিয়ে বিতর্ক

২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সংঘাতের পর দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর প্রশাসনের কূটনৈতিক উদ্যোগ ও বাণিজ্যিক চাপ দুই দেশকে সংঘাত বন্ধে রাজি হতে সাহায্য করেছে।

তবে ভারত সরকার তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার দাবি অস্বীকার করে জানায়, দুই দেশের সামরিক কর্তৃপক্ষের সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমেই যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত হয়। ফলে সংঘাত প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া আর দীর্ঘদিনের বিরোধের সমাধান হওয়া এক বিষয় নয়।

ইসরাইল-ইরান: যুদ্ধবিরতির পর নতুন সংঘাত

২০২৫ সালের জুনে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে।

তবে ২০২৬ সালে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ায় আগের যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একটি সংঘাত সাময়িকভাবে থামাতে ভূমিকা রাখা কূটনৈতিক সাফল্য হতে পারে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে নতুন যুদ্ধ শুরু হলে সেটিকে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা বলা কঠিন।

কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড: সমঝোতা হলেও বিরোধ অমীমাংসিত

কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের সীমান্তসংঘাত নিরসনে ট্রাম্প প্রশাসন কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা হলেও সীমান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি। পরবর্তী সময়ে আবারও উত্তেজনা ও সংঘাতের খবর এসেছে।

এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সংঘাত প্রশমনে সহায়ক হয়ে থাকতে পারে। তবে বিরোধের মূল কারণ অমীমাংসিত থাকলে যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হয়েছে—এমন দাবি প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আর্মেনিয়া-আজারবাইজান: কূটনৈতিক অগ্রগতি, বাকি কাজও আছে

দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে দীর্ঘদিনের বিরোধ নিরসনে ২০২৫ সালের ৮ আগস্ট ওয়াশিংটনে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের নেতারা একটি যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন। ট্রাম্প ওই সমঝোতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ানও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন।

তবে যৌথ ঘোষণা ও পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি এক বিষয় নয়। সীমান্ত নির্ধারণ, চুক্তির বাস্তবায়ন এবং কয়েকটি মানবিক ইস্যুর নিষ্পত্তির মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের কূটনৈতিক উদ্যোগের বাস্তব ভিত্তি থাকলেও সব বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে বলা যায় না।

কঙ্গো-রুয়ান্ডা: চুক্তির পরও সংঘাতের ঝুঁকি

আফ্রিকার গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো ও রুয়ান্ডার মধ্যে পূর্ব কঙ্গোর সশস্ত্র সংঘাত দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ও চুক্তি হয়েছে।

কিন্তু চুক্তি সই হওয়া মানেই মাঠপর্যায়ে সহিংসতা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। পূর্ব কঙ্গোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং সংঘর্ষ অব্যাহত থাকার খবর পাওয়া গেছে। ফলে এ সংঘাতকে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে বলে দাবি করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।

গাজা: যুদ্ধবিরতি আছে, স্থায়ী শান্তি অনিশ্চিত

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি-বন্দিবিনিময় চুক্তির প্রথম ধাপ কার্যকর হয়। জিম্মিদের মুক্তি এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে চুক্তির পরবর্তী ধাপগুলো বাস্তবায়ন, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, গাজার পুনর্গঠন এবং নতুন প্রশাসন প্রতিষ্ঠার মতো বিষয় নিয়ে অচলাবস্থা রয়েছে। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সহিংসতা ও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।

এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতিকে কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা গেলেও গাজায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

মিসর-ইথিওপিয়া: বিরোধ আছে, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়

নীল নদের ওপর ইথিওপিয়ার বৃহৎ জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণকে কেন্দ্র করে মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। মিসরের আশঙ্কা, বাঁধটির পরিচালনা নীল নদের পানিপ্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, ইথিওপিয়া প্রকল্পটিকে উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।

ট্রাম্প এ বিরোধ নিরসনে ভূমিকা রাখার দাবি করেছেন। তবে দুই দেশের মধ্যে তাঁর মেয়াদে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চলছিল, যা তাঁর উদ্যোগে বন্ধ হয়েছে—এমন দাবি প্রতিষ্ঠার মতো তথ্য প্রতিবেদনে নেই। তাই এই বিরোধকে ‘যুদ্ধ বন্ধের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সার্বিয়া-কসোভো: উত্তেজনা আছে, যুদ্ধ বন্ধের দাবি প্রশ্নবিদ্ধ

সার্বিয়া ও কসোভোর মধ্যে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, সার্বীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমানো ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে।

তবে ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদে দুই পক্ষের মধ্যে এমন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চলছিল, যা তাঁর উদ্যোগে শেষ হয়েছে—এমন দাবি প্রতিষ্ঠার মতো প্রমাণ নেই। ফলে এ বিরোধকে যুদ্ধ বন্ধের উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা কতটা যথাযথ, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

আট যুদ্ধ বন্ধের দাবি কতটা বাস্তবসম্মত?

ট্রাম্প প্রশাসন কয়েকটি সংঘাতে যুদ্ধবিরতি, আলোচনার আয়োজন এবং কূটনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে। আর্মেনিয়া-আজারবাইজান সমঝোতা, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি এবং ইসরাইল-হামাসের মধ্যে চুক্তি এ ক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে। তবে প্রতিটি ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার মাত্রা এক নয়; সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যেও পার্থক্য রয়েছে।

অন্যদিকে, কঙ্গো-রুয়ান্ডা ও গাজার মতো ক্ষেত্রে সংঘাতের অবসান এখনো অনিশ্চিত। ইসরাইল-ইরানের ক্ষেত্রেও আগের যুদ্ধবিরতির পর নতুন সংঘাত শুরু হয়েছে। মিসর-ইথিওপিয়া এবং সার্বিয়া-কসোভোর বিরোধকে সরাসরি যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

তাই ট্রাম্পের দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন—এমন সিদ্ধান্তে না গিয়ে বলা যায়, কয়েকটি সংঘাতে তাঁর প্রশাসন কূটনৈতিক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সবগুলোকে যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা এবং সেগুলোর স্থায়ী সমাপ্তির কৃতিত্ব এককভাবে নিজের বলে দাবি করা সংঘাতগুলোর বাস্তব পরিস্থিতিকে পুরোপুরি তুলে ধরে না।

কে এই নাভি পিল্লাই?

নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব। তিনি ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ছিলেন। এর আগে রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক ও পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবেও কাজ করেছেন।

২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর তাঁকে শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেয় নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি।

নোবেল শান্তি পুরস্কার কে দেয়?

ট্রাম্পের সমালোচনায় নরওয়ের নাম এলেও নোবেল শান্তি পুরস্কারের সিদ্ধান্ত নরওয়ে সরকার সরাসরি নেয় না। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি পুরস্কারপ্রাপক নির্বাচন করে। কমিটির সদস্যরা নরওয়ের পার্লামেন্টের মাধ্যমে নিয়োগ পান, তবে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত কমিটির নিজস্ব দায়িত্ব।

নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিবেচনায় শুধু যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা নয়; শান্তি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ট্রাম্পের দাবি করা কূটনৈতিক সাফল্য এবং পিল্লাইয়ের মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় অবদান ভিন্ন ধরনের কাজ।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের আটটি যুদ্ধ বন্ধের দাবি মূল্যায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কূটনৈতিক সমঝোতা, সাময়িক যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী শান্তির মধ্যে পার্থক্য করা। কোনো সংঘাতে আলোচনার মাধ্যমে সহিংসতা কমানো গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হতে পারে, কিন্তু সংঘাতের মূল কারণ অমীমাংসিত থাকলে তাকে চূড়ান্তভাবে শেষ হয়েছে বলা যায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *