নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা :
ভুল ঠিকানায় কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়ে, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে কর্মরত একটি সংগঠনের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান মো. নুর ইসলাম। নোটিশে নিবন্ধন পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে ৩ (তিন) দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ব্যর্থ হলে হাইকোর্ট ডিভিশনে আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী মো. কামরুল আলম (কামাল) তাঁর মক্কেল মো. নুর ইসলামের পক্ষে ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এই নোটিশ জারি করেছেন। ডাকযোগে নিবন্ধিত চিঠিটি পাঠানো হয়েছে ১২ অক্টোবর, বাংলাদেশ ডাকঘরের অভ্যন্তরীণ মেইল সার্ভিসের মাধ্যমে।
নোটিশে মক্কেলের পরিচয় দেওয়া হয়েছে এভাবে: মো. নুর ইসলাম প্রয়াত আব্দুর রহমান মোল্লার ছেলে। তাঁর বর্তমান ঠিকানা জনানী হোমস-৫, ওল্ড আদ্দিন হাসপাতাল রোড, ব্লক-এ, বাশুন্দরা রিভারভিউ, হাসনাবাদ, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা। স্থায়ী ঠিকানা নড়াইল জেলার লোহাগড়া থানার বেলতিয়া গ্রাম। তিনি ‘বাংলাদেশ ক্রেতা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ফাউন্ডেশন’ (নিবন্ধন নং এস-৬১০৮(৩৫২)/০৬)-এর চেয়ারম্যান। প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ৭০ জি, সিরাজ ম্যানশন (লেভেল-৬), ভিআইপি রোড, পুরানা পল্টন লাইন, ঢাকা-১০০০।
নোটিশ অনুযায়ী, প্রতারণা ও ঠকবাজির বিরুদ্ধে এবং ভোক্তার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৮৬০ (১৮৬০ সালের ২১ নং আইন) অনুযায়ী যুগ্ম-পরিচালক, যৌথমূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের (আরজেএসসি) কার্যালয় থেকে ১৪.১১.২০০৬ তারিখে ১৪৯৩৩-৩৪ নম্বর সনদে এটি নিবন্ধিত হয়। ১৫.১১.২০০৬ তারিখে আবেদন জমা দেওয়ার পর ১৬.১১.২০০৬ তারিখে সংঘস্মারক ও সংঘবিধি গৃহীত হয়। তখন থেকেই নুর ইসলাম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
নোটিশে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ভোক্তাদের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা করা। এ জন্য সারা দেশে কর্মশালা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে, ব্যবসায়ীদের দক্ষ ও সচেতন করা হয়েছে। ‘জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’-এর ৫ ধারায় প্রতিষ্ঠিত ‘জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর’-কে তথ্য-প্রমাণসহ লিখিত প্রতিবেদন দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও জানিয়েছে সংগঠনটি।
নোটিশের ভাষ্য, এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে অসাধু ব্যবসায়ী মহলের একটি বড় অংশ প্রতিষ্ঠানটির ওপর ক্ষুব্ধ হয়। তারা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বক্তব্য প্রচার করে এবং সুনাম ক্ষুণ্ন করার অসৎ উদ্দেশ্যে কাজ করে। এর প্রেক্ষিতে নুর ইসলাম মিরপুর মডেল থানায় ২০.০৯.২০২০ তারিখের ১২৮২ নম্বর সাধারণ ডায়েরিসহ আরও কয়েকটি থানায় জিডি করেন।
নোটিশে আরও দাবি করা হয়েছে, এই বিরোধের জেরে কিছু ব্যক্তি যুগ্ম-নিবন্ধকের কাছে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দাখিল করে।
নোটিশ অনুসারে ঘটনার ধারাবাহিকতা এমন:
১৮.১০.২০২২: আরজেএসসি প্রতিষ্ঠানটির নামে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে। কিন্তু নোটিশে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ঠিকানার পরিবর্তে লেখা হয় ‘৪/৪-বি শুমন প্লাজা, লেভেল-৪, পুরানা পল্টন, ঢাকা’, যা ভিন্ন স্থান। ফলে নুর ইসলাম নোটিশ পাননি এবং অভিযোগের বিষয়ে অবগত হননি।
১১.১২.২০২২: নোটিশ জবাবের সুযোগ না পাওয়া সত্ত্বেও নিবন্ধক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন। স্মারকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফরমস ও প্রকাশনা অফিসের উপ-পরিচালককে বাতিলের গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়।
১২.১২.২০২২: নিবন্ধন বাতিল করে গেজেট প্রকাশিত হয়।
১৮.১১.২০২৪: বাতিলের বিষয়টি জানার পর নুর ইসলাম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে বাস্তবতা তুলে ধরে নিবন্ধন পুনর্বহালের আবেদন করেন। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
২৭.০৯.২০২৬: তিনি জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে এবং ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ে নিবন্ধিত ডাকযোগে একই আবেদন পাঠান। তবে নোটিশে বলা হয়েছে, আবেদনটি বিবেচনার পর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
নোটিশে বিস্তারিত যুক্তি তুলে ধরে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ঠিকানা ৭০ জি, সিরাজ ম্যানশন হলেও কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঠিকানায়। এর ফলে অভিযোগ খণ্ডন বা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই পাননি তিনি। অথচ ইতোমধ্যে নিবন্ধক বৈধ নিবন্ধন অবৈধ ও খেয়ালিভাবে বাতিল করেছেন, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
আইনজীবীর দাবি, কারণ দর্শানোর নোটিশের অভিযোগগুলো মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রতারণা ও ঠকবাজির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের প্রতিবাদী কণ্ঠ রোধ করা এবং ভোক্তাদের ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ন করার অসৎ উদ্দেশ্যেই কেউ কেউ ভুল ঠিকানায় নোটিশ পাঠিয়েছেন। নোটিশে আইনের একটি মৌলিক নীতির কথাও স্মরণ করানো হয়েছে “No one can be condemned unheard” অর্থাৎ কাউকে না শুনে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। নোটিশের ভাষ্য, কারণ দর্শানোর নোটিশ না পৌঁছালে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এই নীতির পরিপন্থী।
এ ছাড়া নোটিশে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষায় সব সময় সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব ও তথ্য পাঠিয়ে এসেছে, আর অসৎ ব্যক্তিরাই এর বিরুদ্ধে কাজ করছে।
নোটিশের শেষ অংশে বলা হয়েছে, সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ভোক্তার বৈধ অধিকার হরণকারী এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে এবং জনস্বার্থ সমুন্নত রাখতে প্রতিষ্ঠানটির বৈধ নিবন্ধন বহাল রাখা অত্যন্ত জরুরি। তাই নোটিশ গ্রহণকারী (২ নম্বর প্রাপক)-কে অনুরোধ করা হয়েছে, নোটিশ পাওয়ার ৩ (তিন) দিনের মধ্যে নিবন্ধন নম্বর এস-৬১০৮(৩৫২)/০৬ বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন পুনর্বহাল করতে এবং বিষয়টি আইনজীবীকে লিখিতভাবে জানাতে।
অন্যথায় মক্কেলের নির্দেশনা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশের হাইকোর্ট ডিভিশনে সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এর পরিণতির দায় প্রাপককে বহন করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। নোটিশের একটি অনুলিপি ভবিষ্যৎ ব্যবস্থার জন্য আইনজীবীর কার্যালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে।
নোটিশে স্বাক্ষর করেছেন আইনজীবী মো. কামরুল আলম (কামাল), এলএল.বি (অনার্স), এলএল.এম (ঢাবি), অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ।