স্টাফ রিপোর্টার:
প্রধান নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, ঢাকা রেশনিং অফিসের ডি-৪ শাখার এআরও তারেকুজ্জামান এবং তদারককারী মো. হোসেন মামুনের বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন, ডিলারদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায় এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণ ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের পূর্ব রসুলপুর এলাকার ২ নম্বর রোডে মামুনের একাধিক ভবন রয়েছে বলে স্থানীয় কয়েকজনের দাবি। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় মো. হোসেন মামুন কীভাবে এত সম্পদের মালিক হয়েছেন, তা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কামরাঙ্গীরচর এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, মহিউদ্দিন আহমেদের ছেলে মো. হোসেন মামুন সরকারি চাকরি করে কীভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ওই বাসিন্দার দাবি, মামুন এলাকায় নিজের সরকারি চাকরির পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করেন।
অন্যদিকে, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত তারেকুজ্জামানের বিরুদ্ধেও বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, গোপালগঞ্জ ও কাশিয়ানী এলাকায় তাঁর সম্পদ রয়েছে। পাশাপাশি রাজধানী ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট থাকার কথাও অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তবে এসব সম্পদের পরিমাণ, মালিকানা এবং বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা জানতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই ও তদন্ত প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের দাবি, খাদ্য রেশনিং কার্যক্রমের আওতায় ডিলারদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, এআরও তারেকুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রতিদিন বিভিন্ন ডিলারের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি ডিলারের কাছ থেকে তিন হাজার টাকা করে নেওয়া হয় বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। একইভাবে তদারককারী মো. হোসেন মামুনের বিরুদ্ধে প্রতিটি ডিলারের কাছ থেকে দুই হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অর্থ আদায়ের ধরন, পরিমাণ, নিয়মিততা এবং অর্থের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত নথি পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সংশ্লিষ্ট রেশনিং কার্যক্রমে প্রতিদিন একাধিক দোকান ও ট্রাকের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি হয়। এ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠলেও এর প্রকৃত হিসাব, ডিলারভিত্তিক লেনদেন এবং সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
এদিকে, খাদ্য রেশনিং কার্যক্রম নিয়ে অনুসন্ধান করতে গেলে সাংবাদিকদের বাধা ও হেনস্তার শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তদারককারী মো. হোসেন মামুনের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও মারধরের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা প্রতিদিনের এক সাংবাদিককে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এআরও তারেকুজ্জামানের নির্দেশে মামুন ও তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি ওই সাংবাদিকের ওপর হামলা চালান। তবে ঘটনার তারিখ, স্থান, আহত সাংবাদিকের বক্তব্য, চিকিৎসার নথি এবং থানায় অভিযোগের তথ্য যাচাই করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের কাজ নিয়ে তারেকুজ্জামান আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। তাঁর নামে উদ্ধৃত বক্তব্যে বলা হয়েছে, সাংবাদিকেরা বেশি বাড়াবাড়ি করেন এবং কোনো অনিয়ম হলে ডিলাররা তাঁদের মারধর করেন। অন্যদিকে, মো. হোসেন মামুনের নামে উদ্ধৃত বক্তব্যে বলা হয়েছে, তিনি ঢাকার ছেলে এবং তাঁর এলাকায় এসে সাংবাদিকতা করার প্রয়োজন নেই। এসব বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া মামুনের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন অভিযোগকারী। তাঁদের দাবি, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত তথ্য জানা যেতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তির মাদক সেবনের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা বৈধ পরীক্ষার ফল ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অপবাদ এড়িয়ে আইনসম্মত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করা জরুরি।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রেস সোসাইটি (বিএইচআরপিএস) খাদ্যমন্ত্রী বরাবর লিখিত আবেদন করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সরকারি রেশনিং কার্যক্রমে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হতে পারে।
সরকারি খাদ্য বিতরণ ও রেশনিং কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, ডিলারদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের নিয়ম অনুসরণ করা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এ অবস্থায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।
তবে অভিযোগের বিষয়ে এআরও তারেকুজ্জামান ও তদারককারী মো. হোসেন মামুনের বিস্তারিত বক্তব্য, সম্পদের বৈধতার পক্ষে তাঁদের ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই অভিযোগগুলোর সত্যতা ও দায় নির্ধারণ করা উচিত।