মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর অন্যতম আইনজীবী ও নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জিয়াউল ইসলাম কাজলসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া অপর দুজন হলেন অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান তুষার ও আতিকুল ইসলাম। তাঁদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার আদালত প্রাঙ্গণে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই গ্রেপ্তার নিয়ে নারায়ণগঞ্জের আইনজীবী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তবে স্লোগান দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা এবং মামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সম্পর্কে পুলিশের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রিকশাচালক তুহিন হত্যা মামলায় নিম্ন আদালত থেকে পুনরায় জামিন পান সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। জামিন পাওয়ার পর আদালতকক্ষ থেকে বের হয়ে প্রাঙ্গণ ত্যাগের সময় তিনি ও তাঁর সমর্থকেরা উচ্চস্বরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। এ সময় আইভীকে বলতে শোনা যায়, ‘জয় বাংলা, দাবিয়ে রাখা যাবে না।’
আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান দেওয়ার ঘটনার পর আইভীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়াউল ইসলাম কাজলসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্থানীয় কয়েকজন আইনজীবীর ধারণা, ওই ঘটনার জের ধরেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকতে পারে। তবে গ্রেপ্তারের প্রকৃত কারণ ও মামলার অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে ঘটনাসংশ্লিষ্ট একটি প্রচারিত ভিডিও নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ভিডিওটি বিশ্লেষণের বরাতে বলা হচ্ছে, অ্যাডভোকেট জিয়াউল ইসলাম কাজলকে স্লোগান দিতে দেখা যায়নি। বরং তাঁর হাতে মামলার নথিপত্রের ফাইল ছিল এবং তিনি স্বাভাবিকভাবে সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর পাশে হাঁটছিলেন। তবে ভিডিওর এই পর্যবেক্ষণ গ্রেপ্তারের পেছনে থাকা মামলার অভিযোগ বা তদন্তের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করে না।
গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে ফতুল্লা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন জানান, আসামিদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
আইভীর নিন্দা ও মুক্তি দাবি
নিজের আইনজীবীকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আদালত প্রাঙ্গণে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আমি দিয়েছি। কারণ এটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান, আমাদের চেতনার স্লোগান। কোনো দলীয় স্লোগান নয়। অথচ এর জের ধরে আমার নিরপরাধ আইনজীবীদের ওপর প্রতিহিংসামূলক আচরণ করা হচ্ছে।”
আইভী আরও বলেন, “ভিডিও ফুটেজ দেখলেই বোঝা যায়, অ্যাডভোকেট জিয়াউল ইসলাম কাজল কোনো স্লোগান দেননি। তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মামলার নথিপত্র হাতে আমার পাশে হাঁটছিলেন। একজন পেশাদার আইনজীবীকে এভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করা আইনের শাসন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।”
বিবৃতিতে তিনি অ্যাডভোকেট জিয়াউল ইসলাম কাজলসহ গ্রেপ্তার হওয়া সবার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন। একই সঙ্গে ঘটনাটিকে প্রতিহিংসামূলক আচরণ হিসেবে উল্লেখ করে এর প্রতিবাদ জানান।
আইনজীবী ও সাংস্কৃতিক মহলে ক্ষোভ
এদিকে একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের আইনজীবী ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারের কারণ, মামলার অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা চলছে।
সাংবাদিকতা ও আইন পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রকৃতি ও মামলার অগ্রগতি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তবে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী, তাঁদের গ্রেপ্তারের সঙ্গে আদালত প্রাঙ্গণের স্লোগান দেওয়ার ঘটনার সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না এবং আদালত পরবর্তী সময়ে তাঁদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলে ঘটনার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে।