চন্দনাইশে হামলায় আহত পরিবার হাসপাতাল থেকে ফিরলেও মিলছে না আইনি প্রতিকার

মো. শফিকুল ইসলাম:

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থানাধীন বরমা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব কেশুয়া এলাকায় জায়গা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলার শিকার একটি নিরীহ পরিবার হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেও কোনো আইনি সহযোগিতা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ১০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বিবাদীদের হামলায় গুরুতর আহত শাহিদা আক্তার চন্দনাইশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং তাঁর স্বামী ও ছেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তবে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর ভুক্তভোগী পরিবার চন্দনাইশ থানায় মামলা দায়ের করতে গেলেও থানা-পুলিশ মামলা গ্রহণ করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, পূর্ব কেশুয়া এলাকার বাসিন্দা মো. শওকত ওসমানের ২০ বছর আগে খরিদ করা জায়গা জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করে আসছিল একই এলাকার স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী চক্র। এই বিরোধের জেরে ইতিপূর্বে বিবাদীরা শওকত ওসমানের মুরগির ফার্ম ও বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ভাঙচুর করে। উক্ত ঘটনার প্রতিকার চেয়ে থানায় সুরাহা না পাওয়ায় শওকত ওসমানের স্ত্রী শাহিদা আক্তার (৪১) বাদী হয়ে চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি ফৌজদারি অভিযোগ (সি.আর. মামলা নং-৭১৮/২০২৬) দায়ের করেন। মামলায় অভিযুক্তরা হলেন—আবদুর রহিম (৫৫), জয়নাল আবেদীন (৪৭), মো. মজিব (৫০), হিফাজুল কায়েছ (২২), মো. ইমরুল (২৪) এবং মো. সাজিদ (২১)।

আদালতে মামলা দায়ের করার পর আসামিরা আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ক্রমাগত হুমকি দিতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে বিবাদীরা লোহার রড, লাঠিসোঁটা এবং দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শাহিদা আক্তারের বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়। বাধা দিতে গেলে সন্ত্রাসীরা শাহিদা আক্তার, তাঁর কলেজপড়ুয়া ছেলে মো. সিহাব উদ্দিন (১৯) এবং স্বামী শওকত ওসমানকে লোহার রড ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম করে। পরবর্তীতে স্থানীয় লোকজন এসে তাঁদের উদ্ধার করে চন্দনাইশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান। আহতদের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চন্দনাইশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বরত চিকিৎসক স্বামী ও ছেলেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন।

হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ভুক্তভোগী পরিবারটি বাড়িতে ফিরলেও বর্তমান পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গুরুতর আহত শাহিদা আক্তার এবং তাঁর ছেলে ও স্বামী বাড়িতে ফিরেই আসামিদের পক্ষ থেকে নতুন করে প্রাণনাশের হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন। মামলা তুলে না নিলে ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া এবং সপরিবারে এলাকা ছাড়া করার হুমকি দিচ্ছে চিহ্নিত আসামিরা বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

এদিকে, ঘটনার সত্যতা জানতে আমাদের প্রতিবেদক অভিযুক্ত ‘আবদুর রহিম গ্যাং’-এর নেতা আবদুর রহিমের সঙ্গে মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। তবে তাঁর ফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সাড়া পাওয়া যায়নি। ফোনটি রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চিকিৎসা শেষে ভুক্তভোগী পরিবারটি নতুন এই হামলার সপক্ষে হাসপাতালের মেডিকেল কাগজপত্র নিয়ে চন্দনাইশ থানায় মামলা করতে গেলে থানা কর্তৃপক্ষ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায় বলে অভিযোগ উঠেছে। বারবার থানার দ্বারে দ্বারে ঘুরেও অসহায় পরিবারটি কোনো আইনি সহযোগিতা বা পুলিশের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস পাচ্ছে না। পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার কারণে আসামিরা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। ফলে পুরো পরিবারটি এখন চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছে।

ভুক্তভোগী শাহিদা আক্তার অত্যন্ত ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “সন্ত্রাসীরা আমাদের মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে হামলা করল, আমার ছেলে এবং স্বামীকে রক্তাক্ত করল, যার সমস্ত প্রমাণ হাসপাতালের কাগজে আছে। অথচ চিকিৎসা শেষ করে থানায় আসার পরও পুলিশ আমাদের মামলা নিচ্ছে না। আমরা কি এ দেশের নাগরিক নই? আমরা কার কাছে বিচার চাইব? আসামিদের হুমকিতে আমরা এখন নিজের ঘরেও ঘুমাতে পারছি না।”

ভুক্তভোগী পরিবারটি এই অসহায় অবস্থায় চন্দনাইশ থানা-পুলিশের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং অবিলম্বে মামলা গ্রহণ করে আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি)সহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *