নিজস্ব প্রতিবেদক:
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এয়ারসাইড এলাকায় শত শত যানবাহনের অবাধ চলাচলকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও অ্যাপ্রোন এলাকায় চলাচলকারী এসব যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে কার্যকর ট্র্যাকিং ব্যবস্থা না থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নির্দেশনা অনুযায়ী যানবাহনে ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) স্থাপনের কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স ও সংস্থাগুলোর অনেকেই তা বাস্তবায়ন করেনি বলে জানা গেছে।
বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল উড়োজাহাজের নিরাপদ ওঠানামা এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, রানওয়ে কিংবা ট্যাক্সিওয়েতে কোনো যানবাহন ভুলভাবে প্রবেশ করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অথচ ভিটিএস স্থাপন ও কেন্দ্রীয় নজরদারি নিশ্চিত করতে বারবার নির্দেশনা দেওয়ার পরও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, এয়ারসাইড এলাকায় যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন যান কোথায় যাচ্ছে, কী গতিতে চলছে এবং অনুমোদিত এলাকায় রয়েছে কি না—এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা প্রয়োজন। রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় একটি যানবাহনের ভুল চলাচলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাঁর মতে, দ্রুত সব যানবাহনকে কেন্দ্রীয় নজরদারির আওতায় আনার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নির্দেশনা মানতে বারবার তাগিদ বেবিচকের
বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম জানিয়েছেন, ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম স্থাপনের জন্য এয়ারলাইন্সগুলোকে একাধিকবার সময় দেওয়া হয়েছে এবং তাগিদও দেওয়া হয়েছে। এবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভিটিএস স্থাপন না করলে সংশ্লিষ্ট যানবাহন এয়ারসাইডে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, বিশ্বের আধুনিক বিমানবন্দরগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। শাহজালাল বিমানবন্দরে ভিটিএস কার্যকরভাবে চালু হলে এয়ারসাইডে চলাচলকারী অনুমোদিত যানবাহনের গতিবিধি কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে ভিটিএস না থাকায় এসব গাড়ির চলাচল কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, কোন এয়ারলাইন্স কতটি গাড়িতে ভিটিএস স্থাপন করেছে এবং কতটি গাড়িতে এখনো স্থাপন বাকি রয়েছে, সে তথ্য চাওয়া হয়েছে। ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার, এয়ার অ্যাস্ট্রা, স্কাই ক্যাপিটাল এয়ারলাইন্সসহ বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিভিন্ন দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্স ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে একাধিকবার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে জানা গেছে।
সময়সীমা পেরোলেও স্থাপন হয়নি সব গাড়িতে
বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোন এলাকায় উড়োজাহাজ ও অন্যান্য যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বেবিচক ভিটিএস স্থাপন বাধ্যতামূলক করেছে। চলতি বছরের ১৫ জুনের মধ্যে সব যানবাহনে ভিটিএস স্থাপন করে তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বেবিচকের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে গত ২৬ অক্টোবর একটি জরুরি চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে ২৭ অক্টোবরের মধ্যে শতভাগ যানবাহনে ভিটিএস স্থাপন সম্পন্ন করে তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও কোনো উড়োজাহাজ কোম্পানি তাদের ভিটিএসযুক্ত যানবাহনের তালিকা জমা দেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় ৭ ডিসেম্বরের পর ভিটিএস ছাড়া কোনো যানবাহনকে এয়ারসাইডে চলাচলের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনসংক্রান্ত স্টিয়ারিং কমিটির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভিটিএস স্থাপন না করার কারণে কোনো দুর্ঘটনা বা নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দায়ভার বহন করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে।
ট্র্যাকার আমদানিতে সময় লাগছে, বলছে এয়ারলাইন্স
বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যানবাহনে ট্র্যাকার স্থাপন করা হলে রাডারভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি গাড়ির অবস্থান ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যাবে। কোনো গাড়ি বিপজ্জনক এলাকায় অবস্থান করলে দ্রুত সতর্ক করা সম্ভব হবে। এতে নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বিমান ওঠানামার নিরাপত্তা আরও জোরদার করা যাবে।
ভিটিএস স্থাপনে দেরির বিষয়ে এয়ার অ্যাস্ট্রার হেড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড এয়ারলাইন সিকিউরিটি গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) এবিএম সারওয়ার জামান বলেন, ভিটিএস বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে বলে কিছুটা সময় লাগছে। তৃতীয় টার্মিনাল চালুর আগেই এ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভিটিএস স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শিগগিরই সংশ্লিষ্ট যানবাহনের তালিকা বেবিচকের কাছে জমা দেওয়া হবে।
আগেও ঘটেছে একাধিক দুর্ঘটনা
বিমানবন্দরে যানবাহনের চলাচল ও উড়োজাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে অতীতেও একাধিক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের নভেম্বরে শাহজালাল বিমানবন্দরে একটি পুশকার্টের ধাক্কায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বোয়িং উড়োজাহাজের নোজ হুইল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ফ্লাইটটি বাতিল করতে হয়েছিল।
এর আগে ২০২২ সালে বিমানের হ্যাঙ্গার থেকে একটি বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজ বের করার সময় সেটি সেখানে অবস্থানরত আরেকটি বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজকে ধাক্কা দেয়। একই বছর ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ট্রলি বিমানের একটি উড়োজাহাজে আঘাত হানে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যানবাহনের চলাচলে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
প্রযুক্তি থাকলেও পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না
বেবিচক সূত্র জানায়, শাহজালাল বিমানবন্দরে অ্যাডভান্সড সারফেস মুভমেন্ট গাইডেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (এ-এসএমজিসিএস) এবং ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারে প্রতিটি গাড়ির গতি, অবস্থান ও চলাচলের পথ তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে উড়োজাহাজের গ্রাউন্ড সাপোর্ট যান, ক্যাটারিং ভ্যান ও কার্গো ভ্যানে পৃথক ট্র্যাকার না থাকায় প্রযুক্তির পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রোন ও আশপাশের এলাকায় অবস্থানরত বা চলাচলরত উড়োজাহাজ এবং অন্যান্য যান্ত্রিক যান শনাক্ত করা সম্ভব। উড়োজাহাজে প্রয়োজনীয় শনাক্তকরণ প্রযুক্তি সাধারণত নির্মাণের সময়ই সংযোজিত থাকে। কিন্তু গাড়ি, বাস ও অন্যান্য সেবা যান শনাক্ত করতে সেগুলোতে বিশেষ ভেহিকেল ট্র্যাকার স্থাপন করতে হয়।
বিমানবন্দরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে শতাধিক ভেহিকেল ট্র্যাকার ও সংশ্লিষ্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব সরঞ্জাম আরও বাড়ানো সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় যানবাহনের চলাচল নিরাপদ রাখতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা, নির্দেশনা বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় রানওয়ে ও অ্যাপ্রোন এলাকায় যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।