আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ফিলিস্তিনের পক্ষে সোচ্চার অবস্থান নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে জয় পেয়েছেন আবদুল এল-সায়েদ। তাঁর এই বিজয় মার্কিন রাজনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যুতে অবস্থান নেওয়ার নতুন বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
গত ৩ নভেম্বর মিশিগানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে সিনেটর নির্বাচিত হন ড. আবদুল এল-সায়েদ। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স পেয়েছেন ৪৬ শতাংশ ভোট।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম-আমেরিকান হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন এল-সায়েদ। তিনি সিনেটে আসন পাওয়া ষষ্ঠ আরব-আমেরিকান।
এল-সায়েদের বিজয় ডেমোক্র্যাটদের বড় নির্বাচনী সাফল্যের অংশ। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলটি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে।
তবে তাঁর জয়কে শুধু দলীয় সাফল্য হিসেবে দেখছেন না সমর্থকেরা। তাঁদের মতে, ইসরাইলের দখলদারত্ব ও নীতির সমালোচনা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কথা বলাও নির্বাচনে সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা নয়—মিশিগানের ফলাফল সেই বার্তা দিয়েছে।
ইসরাইলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
নির্বাচনী প্রচারণার পুরো সময় এল-সায়েদকে বারবার প্রশ্ন করা হয়েছে, তিনি ইসরাইলের ‘অস্তিত্বের অধিকার’ স্বীকার করেন কি না।
এর জবাবে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, রাজনীতিবিদদের কখনো ফিলিস্তিনের অস্তিত্বের অধিকার কিংবা ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে একইভাবে প্রশ্ন করা হয় কি না।
এল-সায়েদের বক্তব্য, ফিলিস্তিনিদের নিজেদের মাতৃভূমিতে স্বাধীনভাবে, সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাসের অধিকার রয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে মিশিগানের একদল রাব্বি, ক্যান্টর ও ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতারা ‘নননেগোশিয়েবল মিশিগান’ নামে একটি প্রচারাভিযান শুরু করেন। জিওনেস অ্যাকশন ফান্ডের সমর্থনে পরিচালিত এই উদ্যোগে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও দলীয় নেতাদের কাছে পাঁচটি নীতিগত বিষয়ে অঙ্গীকার চাওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল ইহুদিদের নিরাপত্তা, পরিচয় নির্ধারণের অধিকার, ইসরাইলে ইহুদিদের সার্বভৌমত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।
প্রতিবেদনটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইসরাইলকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অবস্থানকে ইহুদি ভোটারদের নিরাপত্তা ও পরিচয়ের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।
এল-সায়েদ ইহুদি নাগরিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে ইসরাইলের সমালোচনাকে ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গে এক করে দেখার প্রবণতার বিরোধিতা করেছেন তিনি।
ভয় ও বিদ্বেষের রাজনীতি
নির্বাচনী প্রচারণার সময় এল-সায়েদের বিরুদ্ধে মুসলিম ও আরববিদ্বেষী প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স ও সমর্থকেরা তাঁর আরব ও মুসলিম পরিচয়কে রাজনৈতিক দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এল-সায়েদের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহ, হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ তোলা হয়। এমনকি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার প্রতি তাঁর সমর্থন রয়েছে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়াহ আইন চালুর চেষ্টা করবেন—এমন প্রচারণাও চালানো হয়েছিল।
প্রতিবেদনটির লেখকের মতে, এসব অভিযোগের উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে বহিরাগত ও বিপজ্জনক হিসেবে উপস্থাপন করা। নির্বাচনী প্রচারণায় এল-সায়েদ ও তাঁর সমর্থকদের বারবার বলতে হয়েছে, তিনি মিশিগানে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং অন্য মার্কিন নাগরিকদের মতোই একজন আমেরিকান।
‘খারাপ লোকেরাই হেরেছে’
নবনির্বাচিত সিনেটর আবদুল এল-সায়েদ বলেছেন, ‘খারাপ লোকেরাই হেরেছে।’
তাঁর সমর্থকদের মতে, মিশিগানের ভোটাররা ভয় ও বিদ্বেষভিত্তিক প্রচারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে এই ফলাফলকে বিদ্বেষের রাজনীতির সম্পূর্ণ পরাজয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এল-সায়েদের জয় ডেমোক্র্যাট দলের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সেই যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছে, যেখানে প্রগতিশীল প্রার্থীদের নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা কম বলে দাবি করা হয়।
দলীয় প্রাইমারিতে তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান যুক্তি ছিল, মিশিগানের মতো দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে অতিরিক্ত প্রগতিশীল অবস্থানের কারণে তিনি সাধারণ নির্বাচনে জিততে পারবেন না।
২০২৪ সালের নির্বাচন থেকে শিক্ষা
২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও ফিলিস্তিন ও ইসরাইল ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং এবং ইউগভের পরিচালিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, ইসরাইলের কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিলে কমলা হ্যারিস যত ভোট হারাতে পারেন, তার পাঁচ থেকে সাত গুণ বেশি ভোট পেতে পারেন।
সংস্থাটি শিকাগোয় অনুষ্ঠিত ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করে এবং হ্যারিসের নির্বাচনী প্রচারশিবিরের কাছেও পৌঁছে দেয়। তবে বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভোটারদের উদ্বেগ ও দাবির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের প্রতি কিছু ভোটারের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা আরও বেড়েছে।
এল-সায়েদের বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে ফিলিস্তিন ইস্যুতে রাজনৈতিক অবস্থান এবং প্রগতিশীল রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে তাঁর এই জয়।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই