অনলাইন ডেস্ক:
পদ্মা অয়েলের জেট ফুয়েল সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে তিনটি ঘটনায় প্রায় এক লাখ লিটার জেট ফুয়েলের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। এসব জ্বালানির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
ঘটনাগুলো ঘিরে প্রতিষ্ঠানটির জ্বালানি পরিবহন, ডিপোতে প্রবেশের তথ্য সংরক্ষণ এবং জ্বালানি গ্রহণের নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুই ডিপো ব্যবস্থাপককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্তও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ বিভাগ।
নথিতে সরবরাহ দেখানো হলেও ডিপোতে যায়নি গাড়ি
চলতি বছরের ১১ মার্চ পদ্মা অয়েলের নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর উদ্দেশে চারটি ট্যাংকলরিতে ৭২ হাজার লিটার জেট এ-১ জ্বালানি সরবরাহের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়।
তবে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট চারটি ট্যাংকলরি বাস্তবে ডিপোতে প্রবেশ করেনি। অথচ ডিপোর নিবন্ধন খাতায় গাড়িগুলোর প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় উল্লেখ রয়েছে। জ্বালানি গ্রহণসংক্রান্ত কাগজপত্রেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ, নথিতে সরবরাহ কার্যক্রম সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে জ্বালানি পরিবহন ও গ্রহণের ক্ষেত্রে অসংগতি পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েলের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যবস্থাপকসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
এ ঘটনায় কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ব্যবস্থাপক সাইদুল হকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জ্বালানির মূল্য ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পদ্মা অয়েল।
প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার (মানবসম্পদ) মীর মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন জানান, তদন্তের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সাইদুল হক ছাড়াও ছমীর উদ্দিন, আকতার কামাল, শওকত হোসেন ও মানিক কুমার রায়কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
চট্টগ্রামেও ৯ হাজার লিটার জ্বালানি পাচারের অভিযোগ
গত ১৮ মে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকেন্দ্রিক জেট ফুয়েল সরবরাহ ব্যবস্থায় ৯ হাজার লিটার জ্বালানি পাচারের অভিযোগ ওঠে। প্রাথমিক তদন্তে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে পদ্মা অয়েলের শাহ আমানত বিমানবন্দরের ডিপো ইনচার্জ মো. সোহেল ইদ্রিস এবং গাড়িচালক মো. জসিম উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
পদ্মা অয়েলের মানবসম্পদ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার মীর মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন জানান, চট্টগ্রামের ঘটনায় ডিপো ইনচার্জ সোহেল ইদ্রিসকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে সাড়ে ১৬ হাজার লিটার জেট ফুয়েল জব্দ
এদিকে নারায়ণগঞ্জে পাচারের সময় সাড়ে ১৬ হাজার লিটার জেট ফুয়েল জব্দের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ট্যাংকলরির চালক সাগর হোসেন (২৭) গ্রেপ্তার হয়েছেন।
পরে তাঁর সঙ্গে লরির হেলপার দ্বীন ইসলাম (৫২) এবং মালিক ইয়ার হোসেন ভূঁইয়াকে (৫০) আসামি করে মামলা করা হয়। মামলায় আরও দুজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমদাদ হোসেন গ্রেপ্তার ও মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় তদারকি নিয়ে প্রশ্ন
পরপর তিনটি ঘটনায় বিপুল পরিমাণ জেট ফুয়েলের হিসাব না মেলায় পদ্মা অয়েলের ডিপো ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে ট্যাংকলরি ডিপোতে প্রবেশ না করেও কীভাবে নিবন্ধন খাতায় প্রবেশ ও বের হওয়ার তথ্য যুক্ত হলো, কারা জ্বালানি গ্রহণের নথিতে স্বাক্ষর করলেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নজরদারিতে কোথায় ঘাটতি ছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। এতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ও জ্বালানি আত্মসাতের ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।