কামরুল ইসলাম:
অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা বন্ধ করতে সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় লোহাগাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদ-নদী, খাল-বিল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। সেই সব খবর দেখলেই বোঝা যায়, লোহাগাড়া উপজেলায় কেউই পরিবেশের কথা ভাবে না। এই যেমন লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ, চরম্বা, কলাউজান, পদুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায়—বিশেষ করে আমিরাবাদ ইউনিয়নের রেললাইনের চারপাশে সারারাত ফসলি জমির মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে শক্তিশালী দুইটি গ্রুপ। চরম্বা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে টংকবতী ও ডলু খালসহ বিভিন্ন খালের বালুচরে, টংকবতী ও বালু নদী থেকে ২৪ পাওয়ারসম্পন্ন মেশিন বসিয়ে অবাধে বালু ও মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে।
যদিও এই এলাকায় সরকারিভাবে কোনো বালুমহাল নেই, তারপরও স্থানীয় জামায়াত-শিবির ও বিএনপির নেতাকর্মীরা জোটবদ্ধ হয়ে সিন্ডিকেট করে মাটি ও বালু উত্তোলনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এই সিন্ডিকেটে আবার প্রভাবশালী নেতারা পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে সহযোগিতা করছেন। ইউপি সদস্য ও ঠিকাদাররাও এতে যুক্ত আছেন—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
নদ-নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করলে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে। এর খেসারত দিতে হয় স্থানীয় জনগণকে। পাশাপাশি নদীভাঙন, রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়া, খালের গতিপথ পরিবর্তনসহ জলবায়ু ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও ফসলি জমি ও পাহাড় কাটা রোধে সরকারের পক্ষ থেকে ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের ধারা ৪-এর উপধারা (গ) অনুযায়ী, ‘বালু বা মাটি উত্তোলন বা বিপণনের উদ্দেশ্যে ড্রেজিংয়ের ফলে কোনো নদীর তীর ভাঙনের শিকার হতে পারে—এরূপ’ এলাকায় বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ। উপধারা (ঙ) অনুযায়ী, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন সেচ, পানিনিষ্কাশন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বা নদীভাঙন রোধকল্পে নির্মিত অবকাঠামোর সংলগ্ন এলাকায় বালু বা মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ। এছাড়া আইনের ধারা ৫(১)-এ বলা হয়েছে, ‘পাম্প, ড্রেজিং বা অন্য কোনো মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাবে না।’
আইন থাকার পরও যখন এ ধরনের নিষিদ্ধ কাজ করা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা কী? আরও প্রশ্ন আসে, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের অপকর্ম দেখেও প্রশাসনের লোকজন কীভাবে নীরব থাকে? কীভাবে এ ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম দিনের পর দিন চলতে পারে? স্থানীয়দের মতে, থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের প্রশ্রয় ছাড়া এভাবে অবৈধ বালু ও মাটি উত্তোলন সম্ভব নয়।
স্থানীয় জনগণ আরও বলেন, পরিবেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণেই অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। বালু ও মাটি উত্তোলনকারীদের কাছে ব্যবসা আর টাকাই প্রধান হয়ে উঠেছে। কিন্তু স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কীভাবে এমন অপকর্মে সহযোগী হতে পারেন—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময় নির্দেশনা দিলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। আদালতের নির্দেশনার পরও কেন অবৈধ দখলদার ও বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের সবাইকে দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের আওতায় আনার কোনো বিকল্প নেই।