সম্প্রতি আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে গেছে। আত্মহত্যার সিদ্ধান্তের পেছনে জটিল মনস্তাত্ত্বিক এবং নিউরোবায়োলজিক্যাল কারণ কাজ করে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, যখন একজন ব্যক্তির মানসিক বেদনা বা কষ্টের তীব্রতা তার সহ্য ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন মস্তিষ্কের যৌক্তিক চিন্তা করার ক্ষমতা হ্রাস পায়।
আত্মহত্যার পেছনে প্রধানত দুটি কারনঃ
১. মনস্তাত্ত্বিক কারণ: গভীর বিষণ্ণতা (Depression), তীব্র মানসিক ট্রমা বা দীর্ঘস্থায়ী হতাশা একজন ব্যক্তিকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যায় যেখানে তার কাছে জীবনকে অর্থহীন মনে হতে পারে। একে অনেক সময় “মানসিক টানেল ভিশন” বলা হয়, যেখানে ব্যক্তি তার সমস্যা সমাধানের আর কোনো পথ দেখতে পায় না।
মানসিক রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি থাকে, যেমন—বিষণ্ণতা, বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, মাদকাসক্ত, উদ্বেগে আক্রান্ত ইত্যাদি রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার উচ্চ। বিষণ্ণতার রোগীদের মধ্যে এক ধরনের তীব্র আশাহীনতা তৈরি হয়। দুনিয়ার সবকিছু তারা নেতিবাচকভাবে দেখে। তারা নিজের সম্পর্কে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ও অন্য মানুষ সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তা পোষণ করে। তারা ভাবে, এই পরিস্থিতি দিন দিন আরো খারাপ হবে এবং এটি পরিবর্তনের জন্য শত চেষ্টায়ও কোনো লাভ হবে না। এর চেয়ে মুক্তির একমাত্র উপায় নিজেকে মেরে ফেলা। এই চিন্তায় তাড়িত হয়ে তারা আত্মহত্যা করে। অনেক বিষণ্ণতার রোগী খামোখাই তীব্র অপরাধবোধে ভোগে। ফলে নিজেকে শাস্তি দিতেই তারা আত্মহত্যা করে।
২. নিউরোবায়োলজিক্যাল কারণ: গবেষণায় দেখা গেছে যে, আত্মহত্যার চিন্তা বা আচরণের সাথে মস্তিষ্কের সেরোটোনিন (Serotonin) নামক নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতার সম্পর্ক থাকতে পারে। এটি আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং মেজাজ স্থিতিশীল রাখার কাজ করে। এছাড়াও মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex), যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে, তার কার্যকারিতা সাময়িকভাবে কমে যাওয়ায় আবেগপ্রবণ আচরণ বৃদ্ধি পেতে পারে।
আত্মহত্যার সতর্কসংকেতঃ
— ব্যক্তি যখন মরে যাবে, সবার থেকে অনেক দূরে চলে যাবে এমনটা বলতে শুরু করে।
— সবার থেকে ক্ষমা চায়।
— বিদায় চায়।
— আত্মহত্যার পরিকল্পনার কথা বলে।
— আত্মহত্যার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী জোগাড় করে।
— যদি কেউ আত্মহত্যা কীভাবে করবে, তার অনুশীলন বা রিহার্সেল করে ও আন্তরিকভাবে আত্মহত্যা করার মতো সাহস বাড়াতে চায়।
— ঘুম ও খাওয়া-দাওয়া কমে গেলে, আচার-আচরণে সাংঘাতিক পরিবর্তন ঘটলে তা ঝুঁকি নির্দেশক হতে পারে।
— নিজের চেহারা ও পোশাক-আশাকের সৌর্ন্দযের বিষয়ে অসচেতন হয়ে ওঠে।
— আত্মবিশ্বাস কমে গেলে।
— নিজেকে ঘৃণা করে। ঘনিষ্ঠজনদের দূরে ঠেলে দেয়। নিজেকে অন্যের ওপর বোঝা মনে করে।
— অধৈর্য হয়ে পড়ে। বিরক্তি বেড়ে যায়।
— কেউ কেউ ধূমপান বাড়িয়ে দেয়। অনেকে মদ্যপান বা নেশা গ্রহণ বাড়িয়ে দেয়।
— নিজের জিনিসগুলো দান করতে শুরু করে।
— বড় ধরনের কোনো সমস্যার মাঝে পড়ে বলে সে আর পেড়ে উঠছে না। যেমন—প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তীব্র মানসিক কষ্টে পড়ে গেলে।
— আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে এমন মানুষ। বিশেষত যদি আত্মহত্যার নোট লিখে চেষ্টা করে থাকে, যদি এমনভাবে চেষ্টা করে থাকে যাতে কেউ তার চেষ্টার বিষয়টি ধরতে না পারে, যাতে মৃত্যু নিশ্চিত হয় তাহলে।
— কারো নিজের ক্ষতি নিজে করার ইতিহাস থাকলে। যেমন—কেউ যদি নিজেকে নিজে আহত করে।
— জটিল দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষ।
— বিষণ্ণতা, বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার ইত্যাদি মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে, বিশেষত আশাহীন হয়ে পড়লে।
আত্মহত্যার থেকে বাচার উপায়ঃ
— বিবাহ, সন্তান ও ভালোবাসাপূর্ণ পারিবারিক সম্পর্ক।
— জোরদার সামাজিক সম্পর্ক।
— আত্মনিয়ন্ত্রণ ভালো থাকা।
— পরিবারের প্রতি ভালোবাসা ও তাদের সম্মানহানির কারণ বা ক্ষতির কারণ হওয়ার ভয়।
— ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মচর্চা।
— পেশায় নিয়োজিত থাকা।
— ইতিবাচক চিন্তা করা।
— বাড়ীতে কোন কীটনাশক না রাখা।
— ইদুর মা্রার ঔষুধ বা গ্যাস ট্যাবলেট না রাখা।
করণীয়
— আত্মহত্যার চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারি সেবা নিশ্চিত করুন। ডাক্তার যেভাবে ব্যবস্থাপত্র দেন, সেভাবে অনুসরণ করুন; প্রেসক্রিপশন নিরাপদে সংরক্ষণ করুন এবং রোগী ওষুধ খাচ্ছে ও নিয়ম মানছে, তা নিশ্চিত করুন।
— আত্মহত্যার চেষ্টাকারীর দিকে চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারি বজায় রাখুন। একা ঘরে ঘুমাতে দেবেন না। রুম এমনকি টয়লেটের ছিটকিনি ও তালা অকেজো করুন, যাতে ভেতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিতে না পারে। তার সঙ্গে যারা বসবাস করছে, তারা যাতে তার আত্মহত্যাপ্রবণতার কথা জানেন ও সাবধান থাকতে পারেন, তা নিশ্চিত হোন।
— শরীর কিছুটা ঠিক হলে তাকে মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। প্রয়োজনে মানসিক হাসপাতালে মাসখানেক ভর্তি করে রাখুন। ভর্তি রাখতে অস্বস্তি বোধ করবেন না। আপনি জীবন রক্ষার চেষ্টা করছেন। মানসিক হাসপাতাল বলে লজ্জিত বা দুঃখিত হবেন না।
— তাঁকে মানসিক সমর্থন দিন। তাঁর সমস্যাগুলো জেনে নিয়ে যতটুকু পারা যায়, সমাধান করে দেওয়ার চেষ্টা করুন। সমাধানযোগ্য না হলে তাঁকে জানান যে এই বিপদের দিনে তাঁর সঙ্গে আপনি আছেন। তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করুন। ভুলেও আত্মহত্যার চেষ্টা নিয়ে কটাক্ষ করবেন না। উসকানিমূলক কিছু বলবেন না। তার দুঃখের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। কোনো উপদেশ দেবেন না। শুধু শুনে যান।
— যদি কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করেই ফেলে, তবে একটুও দেরি না করে তাঁকে উদ্ধার করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বা নিকটস্থ যেকোনো হাসপাতালে নিয়ে যান এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করুন।
— যদি বিষপান করে থাকে বা ঘুমের ওষুধ খায়, তবে ডাক্তারের কাছে নেওয়ার আগে বমি করাতে চেষ্টা করুন। সে যাতে ঘুমাতে না পারে, সেই চেষ্টাও করুন। কালবিলম্ব না করে ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন। ফাঁসি নিলে কৃত্রিম পদ্ধতিতে শ্বাস ফেরানোর চেষ্টা করতে পারেন। মুখে মুখ লাগিয়ে ফু দিয়ে শ্বাস চালুর চেষ্টা করতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা, ঘাবড়ে যাবেন না। যদি মাথা কাজ না করে তবে পরিবারের যার মাথা ঠান্ডা, তেমন কারো সঙ্গে কথা বলে দ্রুত পদক্ষেপ নিন। সময়ই জীবন। সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে আত্মহত্যার চেষ্টাকারী বেঁচে যেতে পারে।
— আপনার পরিবারের কারো যদি আত্মহত্যার ঝুঁকি থাকে, তবে তাঁকে সমর্থন দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ করবেন। তাঁর যত্ন নেবেন, লক্ষ রাখবেন, মানসিক সমর্থন দেবেন, শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা নিখুঁতভাবে করবেন।