আশুলিয়ায় বিদ্যুৎ সংকট: শিল্পাঞ্চলের আড়ালে জিম্মি সাধারণ গ্রাহক, নেপথ্যে সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির অভিযোগ

মো. সাইদুল ইসলাম
ঢাকার অদূরে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল আশুলিয়া। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পের হাজারো কারখানা ঘিরে গড়ে ওঠা এ জনপদে দিন-রাত পরিশ্রম করেন লাখো শ্রমিক। অথচ শিল্পাঞ্চলের চাকচিক্যের আড়ালে সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের জীবন যেন চরম দুর্ভোগে নিমজ্জিত। দীর্ঘদিন ধরে অঘোষিত লোডশেডিং, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীনতা, সেবায় অবহেলা, মিটার সংক্রান্ত অনিয়ম এবং ঘুষ ছাড়া সেবা না পাওয়ার অভিযোগে ক্ষোভে ফুঁসছেন আশুলিয়ার জামগড়া পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন নেই। বরং জামগড়া জোনাল অফিসের অধীন বেরুন, মোল্লাবাজার, ঘোষবাগ, নিচিন্দাপুর, এয়াপুর, নরসিংহপুর, উত্তর গুমাইল, ইউসুফ মার্কেটসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রতিদিনই ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনেক সময় মাত্র ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। দিনের পাশাপাশি রাতেও একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যায়। বিশেষ করে রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে রাত ৩টার আগে আর ফিরে আসে না। প্রচণ্ড গরমে এই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা।
শ্রমিকদের ভাষ্য, সারাদিন কারখানায় কঠোর পরিশ্রম শেষে রাতে বাসায় ফিরেও স্বস্তি নেই। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমানো যায় না, ফ্যান চলে না, পানির সংকট তৈরি হয়। ফলে পরদিন কর্মক্ষেত্রেও ক্লান্তি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, শিল্পকারখানার বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে আবাসিক এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে। অথচ এই বিষয়ে কোনো পূর্বঘোষণা দেওয়া হয় না। ফলে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণ জানতে বা অভিযোগ জানাতে জামগড়া পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের হেল্পলাইন নম্বরে বারবার ফোন করলেও অধিকাংশ সময় ফোন রিসিভ করা হয় না। কখনও যোগাযোগ হলেও এক কর্মকর্তা অন্য কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যান। এতে সমস্যার সমাধান তো হয়ই না, বরং গ্রাহকদের হয়রানি আরও বাড়ে।
এছাড়া নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ, মিটার পরিবর্তন, বিল সংশোধন কিংবা জরুরি মেরামতের ক্ষেত্রেও দালালচক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন একাধিক গ্রাহক। তাদের দাবি, নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়াও বিভিন্ন অজুহাতে টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা কিংবা সেবা বিলম্বিত করার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে অফিসের ভেতর ও বাইরে সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ গ্রাহক ন্যায্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে মিটার রিডিংয়ে অসঙ্গতি, অতিরিক্ত বিল এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে গড়িমসির ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় সুশাসনের অভাব, জবাবদিহিতার সংকট এবং কার্যকর তদারকির ঘাটতির কারণে এ ধরনের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ যেমন জরুরি, তেমনি আবাসিক গ্রাহকদেরও মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এ বিষয়ে জামগড়া পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর দাবি, আশুলিয়ার বিদ্যুৎ সংকট, অভিযোগকৃত অনিয়ম, মিটার রিডিংয়ে কারচুপি এবং ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়ে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। একই সঙ্গে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সাধারণ গ্রাহকদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও বৈষম্যহীন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *