রেয়াদুল ইসলাম আফজাল:
ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলমকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে যুব প্রশিক্ষণ ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের নামে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, প্রশিক্ষণের নামে সরকারি বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠান ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড সরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার তথ্য প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ ও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রচারণায় পাওয়া যায়। ২০২৬ সালেও ৬৪ জেলায় ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সম্পৃক্ততার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি অর্থে পরিচালিত যুব প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন, প্রশিক্ষণ পরিচালনা, ব্যয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত এসব প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে কতজন তরুণ প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন এবং প্রশিক্ষণ শেষে কতজন কর্মসংস্থান বা আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারছেন—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসম্মুখে আসা দরকার।
গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাচনেও ছিলেন প্রার্থী
মাসুদ আলমের রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। ২০২৪ সালের গোসাইরহাট উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁকে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনে তিনি ঘোড়া প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং শেষ পর্যন্ত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে পারেননি।
এ সময় তাঁর মনোনয়ন নিয়েও সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়। একটি প্রতিবেদনে মাসুদ আলম নিজেই দাবি করেছিলেন, হলফনামায় একটি নিষ্পত্তিকৃত মামলার তথ্য না দেওয়ার কারণে তাঁর মনোনয়ন স্থগিত হয়েছিল।
রাজনৈতিক প্রভাব ও সম্পদ নিয়ে নানা প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে মাসুদ আলম ব্যবসা ও বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করেন। তাঁর বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক বা সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক প্রভাব, মন্ত্রী বা ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর যোগসাজশ এবং সেই সূত্রে সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও সরকারি নথিপত্রের মাধ্যমে আরও যাচাই প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজধানী ঢাকাসহ শরীয়তপুর এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাসুদ আলমের নামে বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ ফ্ল্যাট, প্লট ও অন্যান্য সম্পদের তথ্য রয়েছে। এমনকি দেশের বাইরেও সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ করেছেন একাধিক সূত্র। তবে এসব সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস ও বৈধতা যাচাই না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
সরকার পরিবর্তনের পরও কীভাবে প্রভাব অটুট?
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাঁর প্রভাব ও বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা নিয়ে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—আগের সরকারের সময়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় কীভাবে তিনি এখনো বিভিন্ন সরকারি প্রশিক্ষণ ও প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ পাচ্ছেন?
এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র, চুক্তি, অর্থ ছাড়, প্রশিক্ষণার্থী সংখ্যা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের নথি পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।
বিপুল অর্থসহ আটকের দাবিও যাচাইয়ের দাবি
মাসুদ আলমকে ঘিরে আরও একটি গুরুতর দাবি বিভিন্ন মহলে প্রচলিত রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর শিক্ষার্থীদের হাতে বিপুল অর্থসহ তিনি আটক হয়েছিলেন এবং বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে প্রভাব খাটিয়ে তিনি সেখান থেকে বের হয়ে যান বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য কিংবা আদালতের নথি পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। তাই আটকের ঘটনা, অর্থের পরিমাণ এবং পরবর্তী সময়ে মুক্তির বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
সরকারি অর্থের স্বচ্ছতা নিয়ে তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্টদের মতে, যুব প্রশিক্ষণ ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ফলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার কিংবা প্রকল্পের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের মাধ্যমে বাস্তবায়িত সরকারি প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ, ব্যয়, প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা, প্রশিক্ষণের ফলাফল, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং প্রকল্প মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে মাসুদ আলমের নামে থাকা কথিত সম্পদ, দেশে-বিদেশে বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠেছে।