স্টাফ রিপোর্টার:
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাছ থেকে একটি অনির্বাচিত ইউনিয়নের নাম ব্যবহার করে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অভিযোগ, করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডেই কর্মীদের কাছ থেকে মাসে ৪০০ টাকা করে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ডিএসসিসির ২ নম্বর অঞ্চলের ১২টি ওয়ার্ডে কর্মরত প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাছ থেকে জোর করে এ টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মী। তাঁদের দাবি, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিভিন্ন ধরনের চাপ ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে ইউনিয়নের নাম ব্যবহার করে কর্মীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ এবং সেই অর্থ ভাগ-বাঁটোয়ারা করার অভিযোগ রয়েছে। কর্মীদের দাবি, ইউনিয়নের নামে চাঁদা আদায়ের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। তাঁদের অভিযোগ, কর্মীদের চাকরি, সুযোগ-সুবিধা ও বিভিন্ন প্রয়োজনের বিষয় সামনে রেখে টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলেন, “যুগ যুগ ধরে আমরা নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমরা বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আশা করেছিলাম, বর্তমান সরকারের সময়ে আমরা নিরাপদে কাজ করতে পারব। কিন্তু এখনো আমাদের কাছ থেকে ইউনিয়নের নাম ব্যবহার করে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। টাকা দিতে না চাইলে নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়।”
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডে কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাছ থেকে জনপ্রতি মাসে ৪০০ টাকা করে সংগ্রহ করা হয়। এ বিষয়ে তাঁদের অভিযোগ, কর্মীদের সম্মতি ছাড়াই কিংবা চাপ প্রয়োগ করে টাকা আদায় করা হচ্ছে। তবে ৭৫টি ওয়ার্ডে মোট কতজন কর্মীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়, কত দিন ধরে এই কার্যক্রম চলছে এবং সংগৃহীত অর্থের প্রকৃত পরিমাণ কত—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অভিযোগ, কোনো কর্মী মারা গেলে তাঁর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তাঁদের দাবি, একজনকে কিছু টাকা দেওয়ার পর অন্য কাউকে দুই মাস পরে সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু কর্মীদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা সংগ্রহ করা হলেও সেই অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, বণ্টন এবং সহায়তা প্রদানের স্বচ্ছতা নিয়ে তাঁদের প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, মাসের পর মাস টাকা সংগ্রহ করা হলে সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, কারা তা পরিচালনা করছেন এবং কত টাকা প্রকৃত উপকারভোগীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য থাকা প্রয়োজন।
কর্মীদের আরও অভিযোগ, ইউনিয়নের কার্যক্রমের নামে টাকা তোলা হলেও এর বৈধতা, নেতৃত্ব নির্বাচন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাঁদের দাবি, একটি নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক প্রতিনিধিত্বমূলক সংগঠন না থাকায় তাঁরা নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় কার্যকরভাবে কথা বলতে পারছেন না। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সংগঠনের নাম ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে কর্মীদের মতামত, সম্মতি এবং অর্থ ব্যয়ের হিসাব নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী আলাউদ্দিনের রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীদের কেউ কেউ। তাঁদের দাবি, অতীতে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তাঁদের জানা নেই। তবে বর্তমানে তিনি বিএনপির বড় নেতা হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা। এসব রাজনৈতিক পরিচয়সংক্রান্ত দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্যের ভিত্তিতে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অভিযোগ, আলাউদ্দিনের সঙ্গে আরও কয়েকজনের সমন্বয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় রয়েছে। তাঁদের দাবি, এই বলয়ের কারণে ডিএসসিসির ২ নম্বর অঞ্চলের ১২টি ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা অসহায় বোধ করছেন। চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা, কর্মক্ষেত্রে চাপ এবং আর্থিক হয়রানির আশঙ্কায় অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে চান না। কয়েকজন কর্মীর ভাষ্য, তাঁদের পক্ষে কথা বলার মতো কার্যকর কোনো প্রতিনিধি না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগের সমাধান হচ্ছে না।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে কর্মীদের চাকরি নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং চাকরি বিক্রি করে দেওয়ার হুমকির অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, চাকরি হারানোর আশঙ্কায় অনেক কর্মী প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। তবে চাকরি বিক্রির অভিযোগ, হুমকির ঘটনা এবং এসবের সঙ্গে কারা জড়িত—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের মূল দায়িত্ব নগরীর সড়ক, নালা ও নির্ধারিত এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা। অথচ তাঁদের অভিযোগ, সংগঠনের নামে অর্থ সংগ্রহ ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড নিয়ে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, তা তাঁদের দৈনন্দিন জীবন ও কর্মপরিবেশকে প্রভাবিত করছে। তাঁরা মনে করেন, কর্মীদের বেতন থেকে কোনো অর্থ সংগ্রহ করা হলে তার আইনগত ভিত্তি, অনুমোদন, সম্মতি এবং ব্যয়ের হিসাব স্পষ্ট থাকা উচিত।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই এ ধরনের অনিয়ম ও হয়রানির পরিস্থিতি চলে আসছে। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, সরকার পরিবর্তনের পর কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ন্যায্য অধিকার এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। কিন্তু তাঁদের দাবি, এখনো ইউনিয়নের নাম ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগের সুরাহা হয়নি। তাঁরা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আলাউদ্দিনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে তাঁর বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের নিবন্ধন ও নির্বাচনের নথি, অর্থ সংগ্রহের হিসাব এবং সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দাবি, তাঁদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হোক। যদি কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে, তবে তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা, সম্মানজনক কর্মপরিবেশ এবং সংগঠনের আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।