ইলিশ আমদানি কমাতে মৎস্য অধিদপ্তরের বারবার চিঠি, উদ্যোগ নেই মন্ত্রণালয়ের

অনলাইন ডেস্ক:

দেশে উৎপাদিত ইলিশসহ রুই, কাতলা, আইড় ও বোয়ালের মতো দেশীয় প্রজাতির মাছ আমদানি নিরুৎসাহিত করে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক (ডিজি) আবদুর রউফের সই করা ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবরের এক চিঠিতে দেশীয় মাছ আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

অধিদপ্তরের ওই চিঠিতে দেশের মৎস্য খাতের অগ্রগতির বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে দেশীয় মাছ আমদানি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মোট ৫০ লাখ ১৮ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে কার্পজাতীয় মাছের উৎপাদন ১৮ লাখ ৬০ হাজার টন। এছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯০ হাজার ৬২০ টন মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে ৬ হাজার ১৪৪ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল।

চিঠিতে বলা হয়, বর্তমান আমদানি নীতি অনুযায়ী ভারত ও মিয়ানমার থেকে রুই, কাতলা, ভেটকি, বোয়াল ও কাঁচকিসহ বিভিন্ন প্রজাতির হিমায়িত মাছ আমদানি হচ্ছে। দেশে সহজলভ্য এসব মাছ ব্যাপকভাবে আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে অভ্যন্তরীণ মৎস্যচাষ ও সামগ্রিক মৎস্য খাতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

একই সঙ্গে জাতীয় মাছ ও জিআই পণ্য ইলিশের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশেই আহরণ ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমদানি করা মাছে ফরমালিন, ভারী ধাতু, অ্যান্টিবায়োটিক, রঞ্জক পদার্থ, প্রিজারভেটিভ ও হিস্টামিনের মতো ক্ষতিকর উপাদান থাকার ঝুঁকির কথাও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর মৎস্য অধিদপ্তর থেকে চিঠি পাঠানোর পর তিন মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন মৎস্য সচিব আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের তা অতিরিক্ত সচিবের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে পাঠান। এরপরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানা গেছে।

চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর ইলিশের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনে জোর দিতে মৎস্য অধিদপ্তর থেকে আবারও চিঠি পাঠানো হয়। সেটিও বর্তমানে ফাইলবন্দি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, বাজারে ইলিশের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে প্রতি বছর পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে সীমিত পরিমাণে ইলিশ আমদানি করে দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে আমদানিনির্ভরতা কমানো না গেলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে একটি টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অতীতে বিভিন্ন সময় বিপুল পরিমাণ ইলিশ আমদানি হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চল দিয়ে ২ হাজার ১১৮ দশমিক ৮৮ টন ইলিশ আমদানি হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭২৩ দশমিক ৮২৫ টন এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৫৪ দশমিক ২৭৯ টন ইলিশ আমদানি করা হয়।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে ইলিশ আমদানির পরিমাণ বেড়ে ৮ হাজার ১২৫ দশমিক ৬১৭ টনে দাঁড়ায়। এ জন্য ব্যয় হয় প্রায় ৬১ লাখ ৬৪ হাজার ৪৮২ মার্কিন ডলার।

বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়েও বিভিন্ন অর্থবছরে ইলিশ আমদানি হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর পরিমাণ কমেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৬৬ টন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৬৫ টন এবং চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৪৫০ টন ইলিশ আমদানি হয়েছে।

তবে আমদানি কমলেও দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ইলিশের উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় ৪৩১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটির মেয়াদ চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হয়েছে। তবে প্রকল্পের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কোনো কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, প্রকল্পে কী কী অনিয়ম হয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন এবং কোন প্রক্রিয়ায় ইলিশ প্রকল্পের অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা গভীরভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

ইলিশসহ দেশীয় মাছের আমদানি পুরোপুরি বন্ধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সাধারণ বাণিজ্য বিধি অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলোকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে পরিমাণগত নিষেধাজ্ঞা আরোপে নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক বিধি অনুসরণ করতে হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইলিশের সরবরাহ, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা, জেলেদের জীবিকা এবং মৎস্যসম্পদের ভারসাম্য বিবেচনায় নিয়ে আমদানি নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে নদী ও জলজ পরিবেশ সংরক্ষণ, অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা, জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণ এবং জেলেদের কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সাবেক পরিচালক ও ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, দেশে যে মাছ উৎপাদিত হচ্ছে, বিশেষ সংকট না থাকলে সেসব মাছ বিদেশ থেকে আমদানির প্রয়োজনীয়তা তিনি দেখেন না। দেশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *