এক মাসে বিচার না হলে আত্মহত্যার হুমকি তনুর বাবার

মোঃ আনজার শাহ:

কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় নৃশংসভাবে খুন হওয়া ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় দীর্ঘ এক দশক পর নতুন অগ্রগতি দেখা দিয়েছে। গতকাল সোমবার কুমিল্লার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলার সন্দেহভাজন তিনজন ব্যক্তির ডিএনএ পরীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সন্দেহভাজন ওই তিনজনই ইতিমধ্যে সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে মামলার বাদী ও নিহত তনুর বাবা ইয়ার হোসেন আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, এক মাসের মধ্যে মেয়ের হত্যার বিচার না পেলে তিনি আত্মহত্যা করবেন। দীর্ঘ দশ বছরের ক্লান্তি ও হতাশায় ভেঙে পড়া এই বাবার আর্তি দেশবাসীর বুকে নতুন করে নাড়া দিয়েছে।

যেভাবে এলো নির্দেশ
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানতে কুমিল্লার সংশ্লিষ্ট আদালত সম্প্রতি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায়। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সকালে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের ঢাকার পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মুমিনুল হকের আদালতে হাজির হয়ে তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে লিখিত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বিচারক সন্দেহভাজন তিনজনের ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেন এবং পরবর্তী তারিখে তদন্তের অগ্রগতি আদালতকে অবহিত করতে বলেন।

আগে প্রোফাইল হয়েছিল, মেলানো হয়নি
তদন্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে জানান, এর আগেই তনুর ব্যবহৃত পোশাক থেকে তিনজন ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে সেই প্রোফাইলগুলো কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তির ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে দেখার কাজটি সম্পন্ন হয়নি। তদন্তের এই অসম্পূর্ণ অধ্যায়টিই এবার সামনে এসেছে। তিনি আরও জানান, সন্দেহভাজন ওই তিনজন বর্তমানে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে রয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর দ্বারে যাবেন তনুর বাবা
গতকাল আদালতে উপস্থিত ছিলেন তনুর বাবা ইয়ার হোসেনও। বুকে মেয়ের ছবি আঁকড়ে ধরে তিনি বলেন, “বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লন্ডনে থাকাকালীন বলেছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তনু হত্যার বিচার করবেন। আমি এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মেয়ের হত্যার বিচার চাইব।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে এই ক্লান্ত বাবা আরও বলেন, “দেশে সব হত্যার বিচার হয়, অথচ আমার তনুর বিচার হয় না কেন? গত দশ বছর ধরে বিচারের আশায় তনুর মাকে নিয়ে যেখানে যেতে বলেছে, ছুটে গিয়েছি। এখন আর পারছি না। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি। এক মাসের মধ্যে মেয়ের হত্যার বিচার না পেলে আমি আত্মহত্যা করব। এই জীবন রেখে আর কী লাভ।”

দশ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা
২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাস-সংলগ্ন ঝোপঝাড় থেকে ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর বিবস্ত্র মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তাঁকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

হত্যার পর প্রথমে পুলিশ, পরে র‍্যাব এবং সর্বশেষ পিবিআই মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে। কিন্তু দশ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার চার্জশিট দাখিল হয়নি, কেউ গ্রেপ্তার হয়নি, বিচারও শুরু হয়নি। দীর্ঘ এই নিষ্ক্রিয়তার পর আদালতের সর্বশেষ নির্দেশ মামলায় নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তনুর পরিবার, মানবাধিকারকর্মী এবং সচেতন নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে এই মামলার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচারের দাবি জানিয়ে আসছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *