স্টাফ রিপোর্টার:
ঢাকার কেরানীগঞ্জে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে এবং প্রকৃত ওয়ারিশদের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিদের ওয়ারিশ সাজিয়ে একাধিক দলিল তৈরির অভিযোগ উঠেছে।
প্রায় ৯৩ শতাংশ জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের এই বিরোধে জাল-জালিয়াতির অভিযোগের পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) থেকে করা ফরেনসিক পরীক্ষায় দলিলে থাকা ফিঙ্গারপ্রিন্ট না মেলার বিষয়টিও সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মামলার আরজি ও সংশ্লিষ্ট দলিলের তথ্যের বরাত দিয়ে জানা যায়, ১৯৭০ সালে গুরু ভক্ত ও গোবিন্দ ভক্ত কৃষ্ণ চন্দ্র রাম ও রাম চন্দ্র দাসের কাছে সাফকলা দলিলের মাধ্যমে শুভাঢ্যা মৌজার ২৫ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। ওই জমির সিএস দাগ নম্বর ৫১০, আরএস দাগ নম্বর ১১৬৮ এবং এসএ দাগ নম্বর ৫১০। এছাড়া এসএ দাগ নম্বর ৫০৫, আরএস দাগ নম্বর ১১৭৬ ও সিএস দাগ নম্বর ৫০৫-এর জমির পরিমাণ ৬৮ শতাংশ। ওয়ারিশের মালিক জমির মোট পরিমাণ প্রায় ৯৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ নেতা আনিসুর রহমান কেবল চন্দ্র মণ্ডল ও তাপস মণ্ডলকে ওয়ারিশ দেখিয়ে একটি কথিত জাল দলিল তৈরি করেন। ওই দলিলে আনিসুর রহমান মৃধা, পিতা-মৃত বজলুর রহমান মৃধা; শাহাবুদ্দিন আহমেদ পিন্টু, পিতা-আবদুল খালেক এবং স্বপন চন্দ্র সরকার, পিতা-শচীন্দ্র চন্দ্র সরকার—এমন কয়েকজনকে দেখিয়ে জমির মালিকানা সংক্রান্ত দলিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
এছাড়া ২০১০ সালে কৃষ্ণ চন্দ্র দাস ও রাম চন্দ্র দাসকে দাতা সাজিয়ে একই সিএস দাগ ৫১০, আরএস দাগ ১১৬৮ ও এসএ দাগ ৫১০-এর শুভাঢ্যা মৌজার ২৫ শতাংশ জমি নিয়ে ১১৭১৭ নম্বর দলিলের মাধ্যমে মকবুল হোসেন, পিতা-মৃত মো. ইউনুছ আলীর নামে পাওয়ার নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তীতে ওই পাওয়ারের ভিত্তিতে মকবুল হোসেন ২৫ শতাংশ জমি নিয়ে আরেকটি দলিল করেন। সেখানে পাওয়ারের বলে আবুল হোসেন, পিতা-মৃত করিম হোসেন এবং মো. সাইদুর রহমান মনির, পিতা-কে এম শহীদ মিয়াসহ কয়েকজনের কাছে সাফকলা দলিল দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, আনন্দ চন্দ্র বিশ্বাসকে দাতা সাজিয়ে ১৯৯৫ সালে কেবল চন্দ্র ও তাপসসহ কয়েকজনের নামে জমি বিক্রির দলিল করা হয়। একইসঙ্গে গুরু ভক্ত ও গোবিন্দ ভক্তের ছেলে হিসেবে আনন্দ চন্দ্র বিশ্বাস ও স্বপন সরকারকে উপস্থাপন করে দলিল তৈরির অভিযোগও রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশ সনদের তথ্য অনুযায়ী, গুরু ভক্ত মণ্ডল ও গোবিন্দ ভক্ত মণ্ডল নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ফলে দলিলে তাদের দাতা হিসেবে দেখানো এবং স্বপন সরকার ও আনন্দ চন্দ্র বিশ্বাসকে তাদের ছেলে হিসেবে উপস্থাপনের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সিআইডির ফরেনসিক রিপোর্টে কী বলা হয়েছে
মামলার আরজি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিতর্কিত দলিলে থাকা ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ফরেনসিক পরীক্ষা করেছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় আনন্দ চন্দ্র বিশ্বাসের ফিঙ্গারপ্রিন্টের সঙ্গে নমুনার মিল পাওয়া গেছে।
অভিযোগ, গুরু ভক্তের ছেলে সাজানো হয়েছে কেবল চন্দ্র দাসকে। সেখানে সিআইডি রিপোর্টে দেখা যায়, আনন্দ চন্দ্র বিশ্বাসের ফিঙ্গারপ্রিন্ট। অথচ ওয়ারিশ সনদ থেকে জানা যায়, গুরু ভক্ত নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
অভিযোগকারীরা বলছেন, মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে দলিল তৈরি, অন্য ব্যক্তিকে ওয়ারিশ সাজানো এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট জালিয়াতির অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা জরুরি।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক, সাক্ষী, সুবিধাভোগী ও জমির দাবিদারদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
একইসঙ্গে বিতর্কিত দলিলগুলোর মূল কপি, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড, ওয়ারিশ সনদ এবং সিআইডির ফরেনসিক প্রতিবেদন যাচাই করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, মো. আনিসুর রহমান মৃধা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতা ব্যবহার করে জমি-সংক্রান্ত জালিয়াতির কাজে সহযোগিতা করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, তাঁর প্রভাবের কারণে জমির দলিল ও মালিকানা-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম সহজে করা সম্ভব হয়েছে।
এ বিষয়ে বিবাদীদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তাদের পাওয়া যায়নি।