স্টাফ রিপোর্টার:
খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (RC Food) ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (DC Food) জুড়ে নতুন করে বিস্ফোরক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন খাদ্য পরিদর্শক মমতাজ পারভীন। ওএমএস ডিলারদের একটি বড় অংশ তাকে ‘দালাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। ডিলার নিয়োগ, খাদ্য বিতরণ, তদারকি ও ঘুষ লেনদেনে তার ভূমিকা নিয়ে পুরো খাদ্য অধিদপ্তরে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
সূত্র জানায়, মমতাজ পারভীন বর্তমানে খুলনা কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগার (সিএসডি)-তে খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত থাকলেও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে সংযুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। ডিলারদের অভিযোগ, তিনি আঞ্চলিক ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে ওএমএসসহ বিভিন্ন খাদ্য কর্মসূচির ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম করে আসছেন। তার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তারা।
ওএমএস কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ
ডিলারদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) কার্যক্রমে ডিলারশিপ পেতে হলে নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়। এসব লেনদেন সরাসরি না হয়ে মমতাজ পারভীনের মতো ‘মধ্যস্বত্বভোগী’দের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বিনিময়ে অনিয়মিত ডিলারদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না এবং নিয়ম ভঙ্গ করেও অনেককে বহাল তবিয়তে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়।
ডিলাররা আরও অভিযোগ করেন, খাদ্য বিতরণে বাস্তবে পর্যাপ্ত চাল ও গম না দিয়ে কাগজে-কলমে কার্যক্রম সম্পন্ন দেখানো হয়। এতে একদিকে সরকারি খাদ্য গুদামের মজুত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আগের দুর্নীতির ধারাবাহিকতা
উল্লেখ্য, চলতি বছরের আগস্ট মাসে খুলনার তৎকালীন আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (RC Food) ইকবাল বাহার চৌধুরী ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (DC Food) কাজী সাইফুদ্দীনের বিরুদ্ধে একই ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাদের বদলি করা হয়। তবে নতুন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ তানভীর হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের পরও অনিয়ম থামেনি বলে দাবি ডিলারদের। তাদের অভিযোগ, মমতাজ পারভীনের মতো কিছু কর্মকর্তা এসব অনিয়মের ‘মূল চালিকাশক্তি’ হিসেবে কাজ করছেন।
ডিলারদের অভিযোগের সারসংক্ষেপ
ডিলারদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগগুলো হলো—
- ডিলার নিয়োগে ঘুষ দাবি এবং ‘দালাল’ এর মাধ্যমে অর্থ লেনদেন।
- খাদ্য বিতরণে নামমাত্র কার্যক্রম দেখিয়ে অসাধু লাভ।
- পরিদর্শনের নামে ডিলারদের হয়রানি ও নিয়মিত মাসোহারা আদায়।
- অনিয়মের প্রতিবাদ করলে ডিলারশিপ বাতিলের হুমকি।
প্রতিবাদ ও প্রশাসনিক নীরবতা
অভিযোগের বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে মমতাজ পারভীনের নাম ও পদবি উল্লেখ থাকলেও এ পর্যন্ত কোনো সরকারি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ক্ষুব্ধ ডিলাররা মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশ করে বিষয়টি সামনে এনেছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) খুলনা অঞ্চলে খাদ্য বিভাগের বিভিন্ন অনিয়ম তদন্ত করছে বলে জানা গেলেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—তদন্ত কি আদৌ কার্যকর হবে, নাকি আগের মতোই বিষয়টি ধামাচাপা পড়বে?
সাধারণ মানুষের ক্ষোভ
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভোক্তাদের অভিযোগ, এ ধরনের দালালি ও কেলেঙ্কারির কারণে সরকার ঘোষিত সাশ্রয়ী মূল্যের খাদ্য সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছায় না। নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অথচ দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় অনিয়ম আরও বেড়ে চলেছে।
দাবি
স্থানীয় ডিলার, ভোক্তা ও সচেতন মহল খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন—দ্রুত নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় খুলনার খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও গভীর সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।