খুলনা সিএসডি গোডাউনে নিম্নমানের ‘ডাস্ট চাল’ বিতরণের অভিযোগ

মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন

খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তরের সেন্ট্রাল স্টোর ডিপো (সিএসডি) গোডাউনে সরকারি চাল বিতরণ কার্যক্রমে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, খুলনা মহানগরীর দরিদ্র ও মেহনতি মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত চালের পরিবর্তে নিম্নমানের বা ‘ডাস্ট চাল’ সরবরাহ করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র ও সাধারণ মানুষের দাবি, সরকারি কর্মসূচি—ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল), ভিজিএফ, ভিজিডি, টিসিবি ট্রাকসেল—এর আওতায় বিতরণকৃত চালের মধ্যে ধুলো, ভাঙা ও নষ্ট চাল দেওয়া হচ্ছে। ফলে হাজার হাজার দরিদ্র মানুষ অপ্রয়োজনীয় এবং নিম্নমানের চাল গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সিএসডি গোডাউনের ব্যবস্থাপক মোঃ ইকবাল হোসেন এবং ইনচার্জ মহাসিন। স্থানীয় সূত্র বলছে, তারা সরকারি ভালো মানের চাল গোডাউনে রেখে নষ্ট চাল বিতরণ পয়েন্টে পাঠাচ্ছেন। অন্যদিকে, ভালো চাল বাইরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ দুর্নীতির সঙ্গে আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ও ডিলারের জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা গেছে, ডিলার পয়েন্টগুলোতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষরা অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। একজন ভুক্তভোগী নারী বলেন, “যে চাল দিচ্ছে, তা ধুলোয় ভরা, ভাঙা আর দুর্গন্ধযুক্ত। এটা খাওয়া যায় না। কিন্তু না নিলে পরিবার না খেয়ে থাকবে।” অন্য একজন শ্রমিক বলেন, “ভালো চালের কথা বলে এই নোংরা চাল দেওয়া হচ্ছে। গরিবের সঙ্গে এমন প্রতারণা চলতে পারে না।”

খাদ্য অধিদপ্তরের সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, সিএসডি গোডাউন থেকে বিতরণকৃত চাল মানসম্মত হতে হবে। নিয়মিত পরিদর্শন ও কোয়ালিটি চেকের মাধ্যমে চালের মান নিশ্চিত করা উচিত। কিন্তু খুলনা অঞ্চলে এসব নিয়মের যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি খুলনা খাদ্য বিভাগে একাধিক দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। ধান-চাল সংগ্রহে ঘুষ, ওএমএস চাল-আটা বিক্রিতে অনিয়ম, ডিলারদের কাছ থেকে কমিশন আদায়—এই ধরনের অভিযোগে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ কয়েকজন কর্মকর্তা বদলি বা তদন্তের মুখোমুখি হয়েছেন। এর প্রেক্ষাপটেই সিএসডি গোডাউনের এই ঘটনা আরও চাঞ্চল্যকর হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা বলছে, সরকারের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি দরিদ্রদের জন্য হলেও দুর্নীতির কারণে তা ব্যর্থ হচ্ছে। খুলনা অঞ্চলে খাদ্য বিতরণে অনিয়ম নতুন নয়; অতীতে ওএমএস পয়েন্টে নামমাত্র চাল বিতরণ করে বাকি অংশ কালোবাজারে যাওয়া, ভুয়া বরাদ্দ, ঘুষ বাণিজ্য ইত্যাদি অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন সংগঠন মনিটরিং করে অনিয়মের প্রমাণও পেয়েছে।

খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “অভিযোগ পেলে তদন্ত হয়। কিন্তু সিএসডি গোডাউনের মজুদ চালের মান নিয়মিত চেক করা হয়।” তবে মোঃ ইকবাল হোসেন ও ইনচার্জ মহাসিনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। শোনা যাচ্ছে, তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ প্রশাসনের কাছে দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছেন। তারা বলছেন, দুর্নীতির কারণে সরকারের ভালো উদ্যোগ নষ্ট হচ্ছে এবং দরিদ্র মানুষের খাদ্য অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দ্রুত গোডাউন পরিদর্শন, চালের স্টক চেক এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। দুর্নীতি দমন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে।

এ ঘটনা খুলনা অঞ্চলের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদি এসব দুর্নীতি বন্ধ না হয়, তাহলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। দৈনিক স্বাধীন সংবাদ প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছে—অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *