কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রামের খুলশী থানা এলাকায় মোটরসাইকেল ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে লুণ্ঠিত একটি ইয়ামাহা আর১৫ আর২এম মোটরসাইকেলসহ মোট তিনটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় এক পুলিশ কনস্টেবলসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খুলশী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং লুণ্ঠিত মোটরসাইকেল উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ অক্টোবর ২০২৬ রাত আনুমানিক ১০টার দিকে মামলার বাদী মারুফুর রহমান অপু (২২) তাঁর বন্ধু এমরান (২৪), নিশাত (২৬) ও আসিফকে (২৩) সঙ্গে নিয়ে তিনটি মোটরসাইকেলে কক্সবাজার ভ্রমণের উদ্দেশ্যে নিজ নিজ বাড়ি থেকে রওনা হন। পরদিন ১৭ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটের দিকে অপু নিজের নামীয় অন-টেস্ট ইয়ামাহা আর১৫ আর২এম মোটরসাইকেল চালিয়ে চট্টগ্রামের খুলশী থানাধীন জাকির হোসেন রোডের ফয়েজ লেক চক্ষু হাসপাতালের সামনে পৌঁছালে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। তাঁর মোটরসাইকেলটির আনুমানিক মূল্য ছিল পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মেরুন রঙের প্রাইভেট কার এবং দুটি মোটরসাইকেল তাঁর পথরোধ করে। প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি গাড়ি থেকে নেমে তাঁর মোটরসাইকেলের চাবি নিয়ে নেন। পরে তাঁরা অপুকে অকারণে গালিগালাজ করেন এবং এলোপাতাড়ি কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে নীলাফুলা জখম করেন। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার ভয় দেখিয়ে তাঁকে জোরপূর্বক প্রাইভেট কারে তুলে নেওয়া হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চক্রের একজন সদস্য অপুর মোটরসাইকেলটি চালিয়ে অন্যত্র নিয়ে যান। অন্য সদস্যরা তাঁকে প্রাইভেট কারে করে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন স্থানে ঘোরাতে থাকেন। পরে রাত আনুমানিক ৩টার দিকে তাঁকে বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন শেরশাহ এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর ব্যবহৃত প্রায় ২০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ভিভো মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এরপর তাঁকে প্রাইভেট কার থেকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
ঘটনার পর লুণ্ঠিত মোটরসাইকেল উদ্ধারের চেষ্টা চলতে থাকে। একপর্যায়ে অনিক নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক আইডি থেকে একটি মোটরসাইকেল বিক্রির বিজ্ঞপ্তি বা স্টোরি প্রকাশ করা হয়। বিষয়টি দেখে বাদী মোটরসাইকেল কেনার আগ্রহ দেখিয়ে অনিক দাশ নামের ওই ব্যক্তির সঙ্গে ফেসবুক মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করেন। আলোচনার একপর্যায়ে মোটরসাইকেলটির দাম পাঁচ লাখ ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। বাদী মোটরসাইকেলটি কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিম প্রদান করেন। পরে মোটরসাইকেলটি হস্তান্তরের জন্য তাঁকে বায়েজিদ লিংক রোডের মুখে পুলিশ বক্সের সামনে যেতে বলা হয়।
এ পরিস্থিতিতে খুলশী থানার ওসি মো. কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল অভিযানের পরিকল্পনা করে। অভিযানে অংশ নেন এসআই গোলাম মোহাম্মদ নাসিম হোসেন, এসআই মো. জালাল আহমেদ, এএসআই মো. জাকির হোসেন, এএসআই মো. এরশাদ আলমসহ থানার অন্যান্য পুলিশ সদস্য। গোপন তথ্য ও বাদীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ২০ অক্টোবর ২০২৬ বায়েজিদ লিংক রোড এলাকায় অভিযান চালানো হয়।
অভিযানকালে চক্রের সদস্য হিসেবে অভিযুক্ত অনিক দাশকে (২৭) গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বান্দরবান জেলা পুলিশ লাইন্সে কর্মরত একজন পুলিশ কনস্টেবল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। তাঁর পিতার নাম গৌতম দাশ এবং মাতার নাম রুপনা দাশ। তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানাধীন দক্ষিণ কাঞ্চনা এলাকায়, হিমাংশু ডাক্তারের বাড়িতে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ লুণ্ঠিত মোটরসাইকেলটির অবস্থান সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করে পরবর্তী অভিযান পরিচালনা করে।
গ্রেপ্তার অনিক দাশকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, লুণ্ঠিত মোটরসাইকেলটি ওয়াহিদ মোহাম্মদ জেবল হোসেন অনিক ওয়াহিদের (৩৯) কাছে রয়েছে বলে জানা যায়। পরে পাহাড়তলী থানাধীন বিটাক বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে এবং মহিউদ্দিন সেলিমকে (৫২) গ্রেপ্তার করা হয়। ওয়াহিদ মোহাম্মদ জেবল হোসেন অনিক ওয়াহিদের পিতার নাম মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এবং মাতার নাম ইয়াসমিন আক্তার। তাঁর ঠিকানা বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন পাঠানপাড়া, ওয়াজেদিয়া অক্সিজেন এলাকার তামান্না বিল্ডিং।
অন্যদিকে গ্রেপ্তার মহিউদ্দিন সেলিমের পিতার নাম আবু আহম্মেদ এবং মাতার নাম শামসুন্নাহার। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানাধীন ধর্মপুর এলাকায়, হাফিজুর রহমান মিস্ত্রির বাড়ি। তাঁর বর্তমান ঠিকানা পাঁচলাইশ মেডিকেলের সামনে বিটিআই নিউ হ্যাভেন ভবনের চতুর্থ তলায়, সিঁড়ির ডান পাশে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াহিদ মোহাম্মদ জেবল হোসেন অনিক ওয়াহিদ ও মহিউদ্দিন সেলিমকে জিজ্ঞাসাবাদে মোটরসাইকেলটির অবস্থান সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যায়। তাঁরা জানান, লুণ্ঠিত মোটরসাইকেলটি মোহাম্মদ ওয়াহেদ নাছির ডায়মন্ডের (৩৮) হেফাজতে রয়েছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ পাহাড়তলী থানাধীন ফইল্লাতলি বাজারের সিদ্দিক কমিশনারের বাড়ির রোডে অবস্থিত কুদ্দুছের গ্যারেজে অভিযান পরিচালনা করে।
সেখানে অভিযান চালিয়ে মোহাম্মদ ওয়াহেদ নাছির ডায়মন্ডকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর পিতার নাম নাছির উদ্দিন এবং মাতার নাম কহিনুর আক্তার। তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামের হালিশহর থানাধীন ফইল্লাতলি বাজারের সিদ্দিক কমিশনারের বাড়ি এলাকায়। অভিযানের সময় তাঁর হেফাজত থেকে মামলার বাদী মারুফুর রহমান অপুর লুণ্ঠিত ইয়ামাহা আর১৫ আর২এম মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত আরও দুটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পুলিশ। সব মিলিয়ে অভিযানে তিনটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের এ অভিযানের ফলে লুণ্ঠিত মোটরসাইকেল উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনায় জড়িত বলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। ফেসবুকের মাধ্যমে মোটরসাইকেল বিক্রির প্রস্তাব এবং অগ্রিম টাকা লেনদেনের ঘটনাটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে। উদ্ধার করা মোটরসাইকেলগুলো কীভাবে চক্রের সদস্যদের হেফাজতে পৌঁছেছিল এবং এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার চারজন ও অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে খুলশী থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলাটি ২০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ২৯ নম্বর মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়। এতে দণ্ডবিধির ৩৬৫, ৩৯৫, ৩৯৭ ও ৪১২ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
খুলশী থানার ওসি মো. কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে লুণ্ঠিত মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং চারজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি চট্টগ্রামে মোটরসাইকেল ছিনতাই ও ডাকাতির বিরুদ্ধে পুলিশের তৎপরতার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে মামলার অভিযোগগুলো তদন্তাধীন এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়টি আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ।