গণমাধ্যমের করপোরেট দখলদারিত্ব: কালো টাকার দাপট ও স্বাধীন সাংবাদিকতার অস্তিত্ব সংকট

এইচ এম হাকিম:

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যম এক চরম ক্রান্তিকাল পার করছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং নৈতিক সাংবাদিকতা আজ কেবল আদর্শিক বুলি নয়, বরং এক ভয়াবহ বাস্তবতার সম্মুখীন। আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, দেশের মিডিয়া হাউসগুলো ক্রমশ একদল অসাধু এবং ‘কালো টাকার’ মালিকদের হাতের পুতুলে পরিণত হচ্ছে। গণমাধ্যম যেখানে হওয়ার কথা ছিল সমাজের দর্পণ এবং শোষিতের কণ্ঠস্বর, সেখানে এটি এখন অপরাধীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সমাজের যে সকল সাদা মনের মানুষ বা সৎ বিনিয়োগকারী সুস্থ ধারার মিডিয়া পরিচালনা করতে চান, তারা বাজারে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। বেতন-ভাতা পরিশোধের অক্ষমতা এবং ক্রমবর্ধমান আকাশচুম্বী ব্যয়ের চাপে পড়ে মাত্র কয়েক মাস পরেই তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অথবা কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়ে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ অস্তিত্বে টিকে থাকছে। এই শূন্যস্থানে দাপটের সাথে প্রবেশ করছে কালো টাকার মালিকরা, যারা মিডিয়া হাউসকে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিজেদের দুর্নীতিকে সুরক্ষা দিতে এবং আরও বড় বড় অপরাধ কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্ন করতে ব্যবহার করছে। এই সিন্ডিকেটবাজ মাফিয়ারা মিডিয়া হাউস খুলে একদিকে যেমন সরকার ও প্রশাসনের চোখে ধুলো দিচ্ছে, অন্যদিকে সাংবাদিকতার লেবাসে নিজেদের অবৈধ সাম্রাজ্য বিস্তার করছে।

এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা কেবল সাংবাদিকতা পেশার ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত। যখন একটি মিডিয়া হাউসের অর্থের উৎস হয় পাচারকৃত টাকা বা সিন্ডিকেট বাণিজ্যের মুনাফা, তখন সেই প্রতিষ্ঠান কখনোই জনস্বার্থে কাজ করতে পারে না। তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় মালিকের অপরাধ ঢেকে রাখা এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা। তারা সাংবাদিকতাকে পুঁজি করে নীতিনির্ধারক মহলে প্রভাব বিস্তার করে এবং নিজেদের কালো টাকাকে সাদা করার বৈধ লাইসেন্স হিসেবে মিডিয়া কার্ড ব্যবহার করে। এর ফলে প্রকৃত এবং সৎ সাংবাদিকরা আজ কোণঠাসা। যারা সত্য প্রকাশে আপসহীন, তারা হয় চাকরি হারাচ্ছেন অথবা জীবন সংশয়ে ভুগছেন। এই ধারা চলতে থাকলে দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। ২০ কোটি মানুষের এই দেশ তখন জিম্মি হয়ে পড়বে গুটিকয়েক অর্থলোভী মাফিয়ার হাতে। ভুল তথ্য, প্রোপাগান্ডা এবং ব্ল্যাকমেইল সংস্কৃতির মাধ্যমে তারা পুরো সমাজব্যবস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবে।

সরকারের জন্য এখন সময় এসেছে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেওয়ার। মিডিয়া হাউসগুলোর অর্থের উৎস এবং মালিকদের আয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অতি দ্রুত একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে প্রতিটি মিডিয়া হাউসের আর্থিক প্রতিবেদন যাচাই করা প্রয়োজন। যারা কালোবাজারি, মাফিয়া এবং দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত, তাদের লাইসেন্স অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মিডিয়া কোনো সাধারণ ব্যবসা নয়; এটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এই স্তম্ভ যদি পচা টাকার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে পুরো রাষ্ট্র কাঠামো যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে যারা মিডিয়াকে অপরাধের ঢাল বানাচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে সাধারণ মানুষ তথ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে এবং রাষ্ট্র একটি বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়বে। ২০ কোটি মানুষের নিরাপত্তা এবং গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত রাখতে এই সিন্ডিকেট বাণিজ্যের শিকড় উপড়ে ফেলার কোনো বিকল্প নেই। সাংবাদিকতাকে রক্ষা করা মানেই দেশ এবং জনগণের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। তাই এখনই সময় রুখে দাঁড়ানোর, নতুবা আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা এক মেরুদণ্ডহীন এবং বিক্রি হয়ে যাওয়া মিডিয়া সংস্কৃতি রেখে যাব, যা হবে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের চরম ব্যর্থতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *