গাজীপুরে সাব-রেজিস্ট্রার বাতেনের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ

সাইদ মৃধা:

গাজীপুরে জমির দলিল নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে সাব-রেজিস্ট্রার আবদুল বাতেনের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দলিল নিবন্ধন, হেবা, বণ্টননামা, ব্যাংক মর্টগেজ, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, ভুল সংশোধনসহ বিভিন্ন ধরনের দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট দলিল লেখকরা। তাঁদের দাবি, নির্ধারিত অর্থ না দিলে নানা অজুহাতে দলিল ফেরত দেওয়া হয়, ফলে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে পড়তে হয় ভোগান্তিতে।

অভিযোগ রয়েছে, গাজীপুর নগরীর মারিয়ালী এলাকায় অবস্থিত রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধন ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। কমপ্লেক্সটির দ্বিতীয় তলায় গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং নিচতলায় যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রি অফিস অবস্থিত। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অফিস দুটিতে বিভিন্ন ধরনের দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি ছাড়াও পৃথকভাবে অর্থ আদায় করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র যাচাই করা প্রয়োজন।

যোগদানের পর নতুন রেট নির্ধারণের অভিযোগ

দলিল লেখকদের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার আবদুল বাতেন গত ২৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন ধরনের দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের নতুন রেট চালু করেছেন। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাঁদের।

অভিযোগ অনুযায়ী, দলিলদাতা বা গ্রহীতার আয়করসংক্রান্ত টিআইএন কিংবা রিটার্ন না থাকলে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। হেবা দলিলের ক্ষেত্রে জমির পরিমাণ ১০ শতাংশ পর্যন্ত হলে ১০ হাজার টাকা এবং ১০ শতাংশের বেশি হলে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন কোম্পানির ব্যাংক মর্টগেজ দলিলের ক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ বিবেচনায় এক লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বণ্টননামা দলিলের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা এবং ভুল সংশোধন ও ঘোষণাপত্র দলিলের ক্ষেত্রে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

দলিল লেখকদের দাবি, এসব অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছ ও প্রকাশ্য হিসাব তাঁদের সামনে উপস্থাপন করা হয় না। ফলে কোন খাতে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, তার প্রকৃত হিসাব সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের পক্ষে জানা কঠিন হয়ে পড়ে।

কমিশনিং দলিলেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ

কমিশনিংয়ের মাধ্যমে সম্পাদিত দলিলের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বায়না, হেবা ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলের ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। অন্যদিকে ভুল সংশোধন ও ঘোষণাপত্র দলিলের ক্ষেত্রে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ঢাকায় কমিশনিংয়ের ক্ষেত্রে সরকারি ফির নামে ১২ হাজার টাকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নয় হাজার টাকা নেওয়া হয়। অথচ তাঁদের দাবি অনুযায়ী, জে-ওয়ান খাতে সরকারি ফি ৩০০ টাকা এবং যাতায়াত বাবদ প্রতি কিলোমিটারে ২০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে।

তবে এসব ক্ষেত্রে কোন ধরনের দলিলের জন্য কী পরিমাণ সরকারি ফি প্রযোজ্য, তা সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ও সরকারি ফি তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা জরুরি। সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হলে তার বৈধতা এবং অর্থের প্রাপক কারা, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

খাস কামরায় টাকা পৌঁছানোর অভিযোগ

সাব-রেজিস্ট্রার আবদুল বাতেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, বিভিন্ন খাত থেকে আদায় করা অর্থ তাঁর খাস কামরায় কর্মরত তিনজন কর্মচারীর মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কর্মচারী অর্থ সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট কাজের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। নির্ধারিত অর্থ না পেলে দলিলের বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে তা ফেরত দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি দপ্তরে সেবা গ্রহণের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। তবে অভিযোগে উল্লিখিত অর্থ গ্রহণের প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের ভূমিকা এবং সাব-রেজিস্ট্রারের সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

সেরেস্তার নামেও পৃথক অর্থ আদায়ের অভিযোগ

খাস কামরার বাইরেও সেরেস্তার নামে পৃথকভাবে অর্থ আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন দলিল লেখকরা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাফ-কবলা দলিলের ক্ষেত্রে ২ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। অন্যদিকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, ঘোষণাপত্র, হেবা, বায়না, চুক্তিনামা, বণ্টননামা, এওয়াজ, হেবাবিল এওয়াজ ও ভুল সংশোধন দলিলের ক্ষেত্রে ৩ হাজার ১০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মোহরার গাজী উম্মে আসমা এবং যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের আনোয়ারা বেগম সেরেস্তার নামে আদায় করা অর্থ গ্রহণ করেন।

দলিল লেখকদের দাবি, সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন খাতে বণ্টন করা হয়। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, দলিলপ্রতি নকলনবিশরা ৬০০ টাকা, দলিল লেখক সমিতি ১ হাজার ২০০ টাকা এবং মসজিদের জন্য ২০০ টাকা পায়। অবশিষ্ট অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব অর্থ বণ্টনের অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি, লেনদেনের হিসাব কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তি এখানে পাওয়া যায়নি। ফলে অর্থের প্রকৃত উৎস, গন্তব্য ও বণ্টনপ্রক্রিয়া যাচাই করা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।

দলিলের মূল্যের ওপরও অর্থ আদায়ের অভিযোগ

গাজীপুর সদর ও যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের মূল্যের ওপরও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, উভয় অফিসে দলিলের মূল্য থেকে প্রতি লাখে দেড় শতাংশ হারে অর্থ নেওয়া হয়। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ খাতের অর্থও বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ-বণ্টন করা হয়।

দলিলের মূল্য যত বেশি, এই হিসাবে আদায় করা অর্থের পরিমাণও তত বাড়তে পারে। ফলে উচ্চমূল্যের জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

তবে এই অর্থ আদায়ের পদ্ধতি, হিসাব সংরক্ষণ এবং অর্থের চূড়ান্ত প্রাপক কারা—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া গেলে অভিযোগের প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

প্রতিদিন দেড় শতাধিক দলিল নিবন্ধনের দাবি

সংশ্লিষ্ট দলিল লেখকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর সদর ও যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রি অফিস মিলিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে দেড় শতাধিক দলিল নিবন্ধন হয়। তাঁদের দাবি, মাসে দলিল নিবন্ধনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজারে পৌঁছায়।

এই বিপুলসংখ্যক দলিল নিবন্ধনের সঙ্গে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, প্রতিটি দলিলের বিপরীতে অর্থ আদায়ের বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করা হলে কথিত অনিয়মের পরিধি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

তবে প্রতিদিন ও প্রতি মাসে নিবন্ধিত দলিলের প্রকৃত সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট খাতে অর্থ আদায়ের পরিমাণ সরকারি নথি ও আর্থিক হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ককে নিশ্চিত দুর্নীতির পরিমাণ হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

দুদকের অভিযান নিয়ে দলিল লেখকদের বক্তব্য

দলিল লেখকদের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার আবদুল বাতেন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের দাবি, গত এপ্রিল মাসে দুর্নীতি দমন কমিশনের জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট অফিসে অভিযান চালানোর পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। বরং তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর তাঁর দাপট আরও বেড়েছে।

তবে ওই অভিযানের উদ্দেশ্য, অভিযানে কী পাওয়া গিয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তাই অভিযানের পরবর্তী পরিস্থিতি জানতে দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।

দলিল লেখকদের দাবি, সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষ যাতে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য না হন, সে জন্য নিয়মিত তদারকি, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা দরকার।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি সংশ্লিষ্টদের

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাব-রেজিস্ট্রার আবদুল বাতেন এবং গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মোহরার গাজী উম্মে আসমার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সেরেস্তার দায়িত্বে থাকা আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আপনি এসে স্যারের সাথে যোগাযোগ করেন। আমাকে এগুলো বলে কোনো লাভ নেই।”

ফলে সাব-রেজিস্ট্রার আবদুল বাতেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করার সুযোগ থাকবে।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

গাজীপুরের দুটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দলিল নিবন্ধনে হয়রানি এবং অর্থ বণ্টনের যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি রাখে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট দলিলের নথি, সরকারি ফি তালিকা, রসিদ, অফিসের আর্থিক হিসাব, নিবন্ধনের পরিসংখ্যান এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য পরীক্ষা করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন ও নিবন্ধন অধিদপ্তরের তদারকির বিষয়টিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের অবস্থান স্পষ্ট করার সুযোগ থাকা উচিত।

জনসাধারণের জমি নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবায় সরকারি ফির বাইরে অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে তা বন্ধ করা জরুরি। আর সে জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *