মোহাম্মদ সোহেল রানা:
রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় চিত্রনায়িকা স্নিগ্ধা চৌধুরী ওরফে মোছা. ইসরাত জাহানকে হাত-পা বেঁধে মারধর, গরম কফি ঢেলে দেওয়া, গলায় চাপ দেওয়া এবং হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। গত ২৪ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যায় ৩০০ ফিট এলাকায় আশিয়ান মেডিকেল কলেজের একটি অফিস কক্ষে এ ঘটনা ঘটে বলে খিলক্ষেত থানায় দেওয়া অভিযোগে দাবি করেছেন ওই চিত্রনায়িকা।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার সময় নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া একটি শর্টগান বের করে গুলি করার ভয় দেখান। পরে তাকে জোরপূর্বক হাত-পা বেঁধে সোফায় ফেলে মারধর করা হয়। কাঠের লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে একাধিকবার আঘাত, চুল ধরে মেঝেতে ফেলে টানাহেঁচড়া এবং মুখে গরম কফি ঢেলে দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন ওই নায়িকা।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এই মুহূর্তে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ। অভিযুক্ত নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া বা তাঁর পক্ষের কারও বক্তব্যও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হওয়ার প্রস্তাব থেকে ঘটনার সূত্রপাত
খিলক্ষেত থানায় দেওয়া অভিযোগের বর্ণনা অনুযায়ী, স্নিগ্ধা চৌধুরী পেশায় একজন চিত্রনায়িকা। গত ২৪ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে ইমন নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে তাকে আশিয়ান গ্রুপের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ জন্য ১৬ লাখ টাকার চুক্তির কথা বলা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি।
পরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে ওইদিন রাত ৮টার দিকে চিত্রনায়িকা তাঁর মাকে সঙ্গে নিয়ে খিলক্ষেত থানাধীন ৩০০ ফিট এলাকার আশিয়ান মেডিকেল কলেজের অফিস কক্ষে যান। সেখানে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার সঙ্গে তাঁদের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।
অভিযোগে বলা হয়, সেখানে চা-নাশতার আয়োজন করা হয়। কিছুক্ষণ পর নায়িকার মা বাসায় অতিথি থাকার কারণে গাড়িযোগে বাসায় চলে যান। এরপর অফিস কক্ষে নায়িকা ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অবস্থান করছিলেন।
‘তুই আমার টাকায় অন্য বেটা নিয়ে পর্দা কিনছিস’
অভিযোগে স্নিগ্ধা চৌধুরী দাবি করেন, তাঁর মা চলে যাওয়ার পর নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, “তুই আমার টাকায় অন্য বেটা নিয়ে পর্দা কিনছিস বাসায়।”
এর জবাবে তিনি বলেন, নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া ভুল করছেন এবং তিনি ওই ব্যক্তি নন, যাকে তিনি মনে করছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এ সময় ইমন নামের ওই ব্যক্তি তাঁকে ইশারা করে নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া যা বলছেন, তা মেনে নিতে বলেন।
এরপর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন ওই চিত্রনায়িকা।
শর্টগান তাক করে গুলি করার হুমকির অভিযোগ
থানায় দেওয়া অভিযোগে স্নিগ্ধা চৌধুরী দাবি করেন, একপর্যায়ে নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া একটি শর্টগান বের করে তাঁর দিকে তাক করেন এবং গুলি করে দেওয়ার ভয় দেখান।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও একপর্যায়ে তাঁকে জোরপূর্বক হাত-পা বেঁধে সোফার ওপর ফেলে দেওয়া হয়। পরে তাঁর গলা চেপে ধরা হয় এবং কাঠের লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে বারবার আঘাত করা হয়।
তাঁর অভিযোগ, তাঁকে চুল ধরে মেঝেতে ফেলে টানাহেঁচড়া করা হয় এবং দফায় দফায় মারধর করা হয়। এতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে বলে দাবি করেছেন তিনি।
গরম কফি ঢেলে দেওয়ার অভিযোগ
অভিযোগে স্নিগ্ধা চৌধুরী আরও বলেন, ওই সময় নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার পিএস হিসেবে পরিচয় দেওয়া মিয়ামি নামের একজন তাঁকে জোর করে কফি খাওয়ানোর চেষ্টা করেন।
তিনি কফি পান করতে না চাইলে তাঁর মুখের ওপর গরম কফি ঢেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন নায়িকা। একই সময়ে কাঁচি হাতে নিয়ে তাঁর চেহারা কেটে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার একপর্যায়ে তিনি কেন তাঁর সঙ্গে এমন আচরণ করা হচ্ছে জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া তাঁকে ‘জেবা টাকিয়া’ বলে সম্বোধন করেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
‘আমি জেবা টাকিয়া নই’
অভিযোগে বলা হয়, নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া তাঁকে উদ্দেশ করে দাবি করেন, তিনি তাঁর কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা নিয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে সংসার করছেন। এ সময় চিত্রনায়িকা বারবার তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, তিনি ‘জেবা টাকিয়া’ নন এবং তাঁকে ভুল ব্যক্তির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
কিন্তু তাঁর দাবি অনুযায়ী, বিষয়টি বোঝানোর পরও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। বরং তিনি আরও উত্তেজিত হয়ে তাঁকে মারধর করতে থাকেন। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় তাঁকে আঘাত করা হয় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ছাড়া লাথি মেরে তাঁকে সোফা থেকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
জোর করে মদ ও ওষুধজাতীয় কিছু খাওয়ানোর অভিযোগ
অভিযোগের আরও একটি অংশে চিত্রনায়িকা দাবি করেন, একপর্যায়ে তাঁর মুখ চেপে ধরে জোরপূর্বক মদের সঙ্গে ওষুধজাতীয় কোনো একটি পদার্থ মিশিয়ে খাওয়ানো হয়।
এরপর নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া অন্য একটি কক্ষে চলে যান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময় পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
বেলকনি দিয়ে পালিয়ে বাঁচার দাবি
চিত্রনায়িকার অভিযোগ অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া অন্য কক্ষে চলে যাওয়ার পর তিনি কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে বের হওয়ার সুযোগ পান। পরে ভবনের প্রথম তলার বেলকনি থেকে নিচে লাফ দিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান বলে দাবি করেন তিনি।
পরে তিনি বাসায় ফিরে যান। ঘটনার পর শারীরিকভাবে অসুস্থ ও আহত অবস্থায় থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে থানায় না গিয়ে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন তিনি।
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা
অভিযোগে স্নিগ্ধা চৌধুরী আরও উল্লেখ করেন, ঘটনার দুই দিন পর ২৬ জুলাই তিনি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে শারীরিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
চিকিৎসা নেওয়ার পর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর খিলক্ষেত থানায় গিয়ে ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করে অভিযোগ দায়ের করেন বলে দাবি করেছেন তিনি।
হত্যাচেষ্টার অভিযোগও রয়েছে
থানায় দেওয়া অভিযোগে চিত্রনায়িকা ঘটনাটিকে শুধু মারধর বা নির্যাতন হিসেবে নয়, তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন। বিশেষ করে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে গুলি করার হুমকি, গলা চেপে ধরা, হাত-পা বেঁধে রাখা এবং দীর্ঘ সময় মারধরের ঘটনাকে তিনি গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তাঁর অভিযোগ, তিনি যদি কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে পালাতে না পারতেন, তাহলে তাঁর আরও বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারত।
পুলিশের তদন্তেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত ঘটনা
ঘটনাটি নিয়ে এখন বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেন একজন চিত্রনায়িকাকে ওই অফিসে ডাকা হয়েছিল, ১৬ লাখ টাকার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর চুক্তির বিষয়টি কতটা সত্য, বৈঠকে কারা উপস্থিত ছিলেন, ঘটনার সময় সেখানে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা চালু ছিল কি না এবং ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কী ভূমিকা পালন করেছেন—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হতে পারে।
এ ছাড়া অভিযোগে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ফলে ঘটনাস্থলে কোনো অস্ত্র ছিল কি না, থাকলে সেটি বৈধ কি না এবং অভিযোগে বর্ণিত পরিস্থিতির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এ বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
একই সঙ্গে চিত্রনায়িকার শরীরে আঘাতের চিহ্ন, চিকিৎসার কাগজপত্র, হাসপাতালের মেডিকেল রেকর্ড, থানায় দেওয়া অভিযোগ, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের তথ্য যাচাই করা হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযুক্তের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
চিত্রনায়িকা স্নিগ্ধা চৌধুরীর অভিযোগে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া ছাড়াও ইমন ও মিয়ামি নামে আরও কয়েকজনের প্রসঙ্গ এসেছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
এদিকে, একজন পেশাজীবী নারী ও চিত্রনায়িকার করা এমন গুরুতর অভিযোগের পর বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগটি সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগটি মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া জরুরি।