ছাতক ঘাটের ওপেন টেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন, পরিচালক সাইফুলের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ

আনোয়ার পাশা:

সুনামগঞ্জের ছাতক নদীবন্দরের ঘাট ইজারা ও নৌযান থেকে শুল্ক আদায়ের প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। মামলা-সংক্রান্ত কারণে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে সংশ্লিষ্ট ঘাট বা পয়েন্টের উন্মুক্ত টেন্ডার স্থগিত থাকার পর সাময়িক কার্যাদেশ দেওয়াকে কেন্দ্র করে এসব প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ সিলেট আঞ্চলিক দপ্তরের ১৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখের নথি অনুযায়ী, হাইকোর্টে দায়ের করা রিট পিটিশন নং-১০৭০৮/২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে ছাতক নদীবন্দরের নৌযান/জাহাজের এলএসসি ও বার্দিং চার্জ আদায় কেন্দ্রের উন্মুক্ত টেন্ডার স্থগিত ছিল। এ অবস্থায় বন্দর থেকে রাজস্ব আদায় অব্যাহত রাখার স্বার্থে ইজারা প্রদান পদ্ধতির ৩৩(ক) ও (গ) অনুযায়ী ঘাট/পয়েন্টটি সাময়িকভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৬ আগস্ট থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৫ দিনের জন্য সাময়িক কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এতে ইজারাদার হিসেবে জুয়েল, পিতা মো. জয়নাল আবেদীনের নাম উল্লেখ রয়েছে। ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত স্পট কোটেশনে ৩০ দিনের জন্য পাওয়া ১ কোটি ১ লাখ ২০ হাজার ৮০০ টাকা হারের ভিত্তিতে ২৫ দিনের ইজারামূল্য নির্ধারণ করা হয় ৮৪ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। এর সঙ্গে ভ্যাট ও আয়কর বাবদ পৃথক অর্থ পরিশোধের তথ্যও প্রকাশিত নথিতে রয়েছে।

ছাতক নদীবন্দরে চলাচলকারী বাল্কহেড থেকে নির্ধারিত শর্তের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের অভিযোগ, বিভিন্ন খাতে প্রতিটি বাল্কহেড থেকে ১৩ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।

তবে কোনো নৌযান থেকে আদায়কৃত অর্থ সম্পূর্ণভাবে অতিরিক্ত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট নৌযানে থাকা পণ্যের পরিমাণ, আদায়ের রশিদ এবং কোন সরকারি ট্যারিফের আওতায় অর্থ নেওয়া হয়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

বিআইডব্লিউটিএর সাময়িক কার্যাদেশে বলা হয়েছে, নৌযান থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত শুল্কের হার অনুযায়ী অর্থ আদায় করতে হবে এবং অধিক শুল্ক নেওয়া যাবে না। ইজারার শর্ত ভঙ্গ হলে কার্যাদেশ বা ইজারা সম্মতিপত্র বাতিলের বিধানও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সরকারি ট্যারিফ অনুযায়ী পণ্য ও সেবাভেদে শুল্কের হার নির্ধারিত রয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইজারা দেওয়া ঘাট বা পয়েন্ট দিয়ে মালামাল ওঠানামার ক্ষেত্রে প্রতি মেট্রিক টন বা অংশবিশেষ ৭০ টাকা হারের বিধান রয়েছে। আবার পণ্যের ধরন ও পরিমাপের ভিত্তিতে অন্যান্য হারও প্রযোজ্য হতে পারে।

এ কারণে নৌযানভেদে আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ, পণ্যের ধরন, পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট রশিদ যাচাই করলেই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাতক ঘাটের ইজারা নিয়ে একাধিক পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। উন্মুক্ত টেন্ডার স্থগিত থাকার সুযোগে সাময়িকভাবে ঘাট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েই মূলত বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে প্রকাশিত নথিতে উন্মুক্ত টেন্ডার স্থগিত থাকার কারণ হিসেবে মামলা-সংক্রান্ত জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইজারা প্রক্রিয়ায় অনিয়ম বা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

ছাতক ঘাটের ইজারা প্রক্রিয়ায় বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক সাইফুলের বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তাঁদের দাবি, ইজারা প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্যতা এই প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য এবং বিআইডব্লিউটিএর লিখিত অবস্থান পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।

ছাতক ঘাটের ইজারা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী ইজারাদারদের পক্ষ থেকে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর মানববন্ধনের কর্মসূচি পালনের কথা জানানো হয়েছে।

ভুক্তভোগী ইজারাদার মোহাম্মদ জুয়েল ও মোহাম্মদ জালাল অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, ইজারা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং সরকারি রাজস্ব সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন।

ছাতক নদীবন্দরের ইজারা নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট টেন্ডার নথি, ইজারা বিজ্ঞপ্তি, সাময়িক কার্যাদেশ, সরকারি রাজস্ব আদায়ের হিসাব, অর্থ জমার কাগজপত্র, নৌযান থেকে আদায়ের রশিদ এবং আদালতের মামলার সর্বশেষ আদেশ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও ইজারা প্রক্রিয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন শাখার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

ছাতক নদীবন্দরের মতো সরকারি রাজস্ব সংশ্লিষ্ট একটি ঘাটের ইজারা ও শুল্ক আদায় নিয়ে অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *