নিজস্ব প্রতিবেদক:
১৯৯৩ সালের অক্টোবর। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে বক্তব্য দিতে নিউইয়র্কে যান। ১ অক্টোবর ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনের ১৩তম প্লেনারি সভায় তিনি বক্তব্য দেন। জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক নথিতেও ওই বক্তব্যের তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে।
সে সময় খালেদা জিয়ার জাতিসংঘ সফর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নিউইয়র্কে অবস্থানকালে The New York Times-এর সাংবাদিক বারবারা ক্রসেট তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেন। ১৭ অক্টোবর ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল “Conversations: Khaleda Zia; A Woman Leader for a Land That Defies Islamic Stereotypes”।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই খালেদা জিয়াকে ঘিরে একটি বিশেষ পরিচয়ের প্রসঙ্গ সামনে আসে। তাঁকে ঘিরে থাকা কর্মকর্তারা বলছিলেন, তিনি নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়া প্রথম মুসলিম নারী। সাংবাদিক এ বিষয়টি নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চান। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে খালেদা জিয়া খুব বেশি উৎসাহ প্রকাশ করেননি; তাঁর সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া ছিল—“Hmmm”।
তবে জাতিসংঘে তাঁর প্রথম ভাষণের বিষয়বস্তু ছিল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু। বক্তব্যে তিনি গণতন্ত্র, উন্নয়ন, মানবাধিকার, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং ছোট রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
খালেদা জিয়া তাঁর বক্তব্যে গঙ্গার পানি বণ্টন, পরিবেশ, শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সমস্যা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ন্যায্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্কের প্রসঙ্গও তাঁর ভাষণে গুরুত্ব পায়। তিনি দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো শান্তিপূর্ণ আলোচনা ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। পাশাপাশি গঙ্গার পানির ন্যায্য বণ্টনের জন্য একটি স্থায়ী সমঝোতার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তখনকার বিভিন্ন সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে ধরে খালেদা জিয়া বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় সহিংসতা ও জাতিগত নিপীড়নের নিন্দা জানান। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
ফিলিস্তিন ইস্যুতেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানান এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
জাতিসংঘে তাঁর প্রথম ভাষণে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে বিশ্বের ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের ভূমিকা জোরদারের আহ্বান জানান।
নিউইয়র্ক সফরের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকার এবং জাতিসংঘে দেওয়া প্রথম ভাষণ—দুই ঘটনাই পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আন্তর্জাতিক পরিসরের আলোচিত অধ্যায় হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবরই ছিল সাধারণ পরিষদে খালেদা জিয়ার প্রথম বক্তব্য।