জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈমকে প্রকাশ্যে মারধর, থানায় নিয়ে হেনস্তা; অভিযোগের তীরে খুলশী থানা পুলিশ

সোহেল মাহমুদ
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফেরার পথে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অফস্পিনার নাঈম হাসানকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে প্রকাশ্যে মারধর, থানায় নিয়ে হেনস্তা এবং অপহরণের চেষ্টার অভিযোগ ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্নের পাশাপাশি সামনে এসেছে আরও গুরুতর অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এক প্রবাসীর বহন করা স্বর্ণ ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি অভিযানের অংশ হিসেবেই ওই অটোরিকশাটিকে টার্গেট করা হয়েছিল। আর সেই ভুল তথ্যের শিকার হন জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার।
শুক্রবার (১২ জুন) রাতের এ ঘটনায় খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম এবং অভিযানে অংশ নেওয়া দুই কনস্টেবলকে প্রত্যাহার করে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্ত সোর্স সোহেলকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের কমিটিও গঠন করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।

বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে শুরু হয় দুঃস্বপ্ন
ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষে রাত ১০টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান নাঈম হাসান। সেখান থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। বিমানবন্দর টোল প্লাজার কাছে এক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য তাদের গাড়ি থামিয়ে লালখান বাজার পর্যন্ত সঙ্গে যান।
লালখান বাজার এলাকায় পৌঁছানোর পর পুলিশ পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি অটোরিকশাটি থামিয়ে তল্লাশি শুরু করেন। প্রথমে চালকের কাগজপত্র নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর নাঈমকে গাড়ি থেকে নামিয়ে গলায় ধাক্কা দিয়ে টানা-হেঁচড়া করা হয়।
অটোরিকশার চালকও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কোনো ধরনের কথাবার্তা ছাড়াই গাড়ি থামানো হয় এবং কাগজপত্র নিয়ে নেওয়া হয়। পরে নাঈম হাসান জাতীয় দলের ক্রিকেটার বলে পরিচয় দেওয়ার পরও তার ওপর হামলা চালানো হয় এবং থানায় নিয়ে যাওয়ার পরও তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়।

‘তুই আসামি, চুপ থাক’
নাঈমের অভিযোগ, খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম লাঠি দিয়ে তার কোমরে আঘাত করেন। একই সময়ে সাদা পোশাকে থাকা পুলিশের সোর্স সোহেল পাইপ দিয়ে তাকে মারধর করেন।

নাঈম বলেন, প্রায় ১০০ থেকে ২০০ মানুষ আমার পরিচয় দিলেও তারা মারধর থামায়নি। উল্টো বলছিল, ‘তুই আসামি, চুপ থাক। একটা কথাও বলবি না।
তিনি জানান, পুলিশের গাড়ি থাকা সত্ত্বেও তাকে তাতে না তুলে অন্য একটি অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।

ক্ষুব্ধ জনতা, সরিয়ে নেওয়া হয় অভিযুক্তদের
নাঈমের দাবি, ঘটনার সময় উপস্থিত লোকজন তার ক্রিকেটার পরিচয় নিশ্চিত করে বারবার অভিযুক্তদের থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা তা শোনেননি। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে এবং জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে পড়লে মারধরে জড়িতদের থানার দোতলায় সরিয়ে নেওয়া হয়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, যে ব্যক্তি তাকে পাইপ দিয়ে আঘাত করেছিলেন, সেই সোর্স সোহেলকে থানার একটি কক্ষে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার সুযোগে অভিযুক্তদের সামনে আনা হয়নি।

“থানায় নিয়েও রেহাই মেলেনি”
মারধরের পর নাঈমকে খুলশী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ওসির কক্ষে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
নাঈমের ভাষ্য, তিনি ঘটনার বর্ণনা দিতে গেলে ওসি বারবার বলেন, “চোখ নিচে নামিয়ে কথা বল।”

তিনি বলেন, ওসির আচরণে কোনো সহানুভূতি ছিল না। বরং তাকে একজন অভিযুক্তের মতো আচরণ করা হচ্ছিল। তবে একপর্যায়ে একটি ফোন আসার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে।
ওসির দাবি, ‘কোনো অভিযানের বিষয়ে জানি না’
পরে সাংবাদিকরা অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে নাঈমের সামনেই খুলশী থানার ওসি দাবি করেন, তিনি কোনো অভিযানের বিষয়ে জানেন না এবং তাকে বিষয়টি অবহিত করা হয়নি।

ওসির এই বক্তব্য নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ একজন এসআই, কনস্টেবল ও সোর্সের অংশগ্রহণে পরিচালিত একটি অভিযানের বিষয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অবগত ছিলেন না, এ দাবি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
‘এত রাতে কমিশনার সাহেবকে বিরক্ত করিনি’
ঘটনার পর সিএমপির উত্তর বিভাগের উপকমিশনার আমিরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে যান। তিনি বলেন, বিষয়টি জানার পর তারা দ্রুত সেখানে পৌঁছান। তবে গভীর রাত হওয়ায় পুলিশ কমিশনারকে তাৎক্ষণিকভাবে বিরক্ত করা হয়নি।
তার ভাষায়, অটোরিকশাটির বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাচালানের তথ্য ছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে তথ্যটি কতটা সত্য ছিল এবং পুরো প্রক্রিয়ায় নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছুটিতে ঢাকায় অবস্থানরত খুলশী থানার এসআই মনিরুল ইসলাম একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় স্বর্ণ চোরাচালানের তথ্য দেন। তিনি দাবি করেছিলেন, একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তিনি এ তথ্য পেয়েছেন।
সেই তথ্যের ভিত্তিতে এসআই শফিকুল ইসলাম লালখান বাজার এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন। তবে পরে কোনো স্বর্ণ বা চোরাচালানের আলামত পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রকৃতপক্ষে এক প্রবাসীর বহন করা স্বর্ণ ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে এ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা ছিল। যদিও অভিযোগটির সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।

‘আমার জায়গায় যদি কোনো সাধারণ মানুষ থাকত?’
নাঈম বলেন, আজ আমার জন্য অনেক মানুষ থানায় এসেছে, অনেক জায়গা থেকে ফোন গেছে। কিন্তু আমার জায়গায় যদি কোনো সাধারণ মানুষ থাকত, তাহলে তার কী হতো? তার জন্য তো কেউ থানায় আসত না।
মধ্যরাতে থানায় ভিড়
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে রাতেই খুলশী থানায় ভিড় করেন নাঈমের স্বজন, বন্ধু ও ক্রিকেটপ্রেমীরা। অভিযুক্তদের শাস্তির দাবি জানান তারা।
নাঈমের বাবা মাহবুবুল আলম অভিযোগ করেন, থানায় গিয়ে তিনিও অসৌজন্যমূলক আচরণের মুখোমুখি হয়েছেন।
শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মারধর ও অপহরণের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
নিন্দা ক্রিকেটাঙ্গনের
ঘটনার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি তামিম ইকবালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং বিষয়টি তাকে অবহিত করা হয়। ক্রিকেটাঙ্গনের বিভিন্ন মহল এবং ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) নেতারাও এ ঘটনায় উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশ করেন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
সকালে নাঈমের বাসায় সিএমপি কমিশনার
শনিবার সকালে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী নাঈম হাসানের বাসায় গিয়ে তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠনের কথাও জানানো হয়।
প্রশ্নটা শুধু নাঈমকে ঘিরে নয়
জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার পরিচয় দেওয়ার পরও যদি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত, সেই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
কারণ, মানুষ যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নিরাপত্তা প্রত্যাশা করে, তখন সেই বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেই যদি ক্ষমতার অপব্যবহার, হেনস্তা কিংবা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনআস্থা। সমাজে তৈরি হয় ভয়, অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাস।
নাঈম হাসানকে ঘিরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা তাই শুধু একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়; এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *