টাঙ্গাইলের পাঁচ শতাধিক স্থায়ী ও অস্থায়ী পশুর হাটগুলো এখন অনেকটা উৎসবমুখর

মোঃ মশিউর রহমান:

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে টাঙ্গাইল জেলাজুড়ে কোরবানির পশুর রেকর্ড জোগান তৈরি হয়েছে। চাহিদা মিটিয়েও এবার জেলায় প্রায় ৪০ হাজার গবাদি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। তবে এই বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও ভারতীয় গরুর অবৈধ অনুপ্রবেশ, পশুর হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়, জাল টাকার কারবারিদের দৌরাত্ম্য, হাইওয়ে হাটে চাঁদাবাজি এবং অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ার আশঙ্কায় চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন জেলার হাজার হাজার খামারি ও সাধারণ ক্রেতারা।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় গড়ে ওঠা ২৬ হাজার ৭৫৯টি ছোট-বড় খামারে এবার কোরবানির জন্য মোট দুই লাখ ৩৩ হাজার ৯৯৩টি পশু সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হৃষ্টপুষ্ট ষাঁড়, বলদ, গাভী, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া। জেলায় এবার কোরবানির পশুর সার্বিক চাহিদা রয়েছে এক লাখ ৯৫ হাজার ১৭৮টি। ফলে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পরও ৩৯ হাজার ৯৮৩টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।

জানা গেছে, কোরবানির এই বিশাল পশুর সমাগমকে ঘিরে টাঙ্গাইলের পাঁচ শতাধিক স্থায়ী ও অস্থায়ী পশুর হাটগুলো এখন অনেকটা উৎসবমুখর। এর মধ্যে বিশেষভাবে নজর কাড়ছে ভূঞাপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গোবিন্দাসী গরুর হাট- যা দেশীয় পশুর এক বিশাল সরবরাহ কেন্দ্র এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ পশুর হাট হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি টাঙ্গাইল শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত বেবীস্ট্যান্ড পশুর হাট, টাঙ্গাইল বৈল্লা বনানী মাঠ এবং শহরতলির করটিয়া ও রসুলপুর, তোরাপগঞ্জ হাটগুলোতেও ক্রেতা-বিক্রেতাদের আনাগোনা বেড়েছে।

ঐতিহ্যবাহী হাটের পাশাপাশি এবার টাঙ্গাইলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অনলাইন পশুর হাট ও ডিজিটাল কেনাবেচা। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের উদ্যোগে এবং বিভিন্ন খামারিদের নিজস্ব উদ্যোগে ফেসবুক পেজ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পশুর ছবি, ভিডিও, ওজন ও দামসহ বিস্তারিত তথ্য আপলোড করা হচ্ছে। অনেক ক্রেতা পছন্দের পশু কিনতে পারছেন- যা হাটের বাড়তি চাপ ও ভোগান্তি অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে।

জেলার সামগ্রিক উদ্বৃত্ত পশু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকার পশুর হাটসহ দেশের অন্যান্য জেলার ঘাটতি মেটাতে বড় ভূমিকা রাখবে- যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে কোটি কোটি টাকার তারল্য প্রবাহ সৃষ্টি করবে।

খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার প্রাণিসম্পদের এই বিপুল সম্ভাবনা এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে। খামারিদের প্রধান সমস্যা পশুখাদ্যের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি। চড়া দামে খড়, ভুষি ও খৈল কিনে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে পশু লালন-পালন করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতীয় গরুর অবৈধ চোরাচালান। খামারিদের দাবি, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চোরাই পথে ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশ করলে দেশীয় পশুর বাজার ধসে পড়বে। জেলার ২৬ হাজারেরও বেশি খামারি তাদের আসল পুঁজি হারিয়ে মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়বেন।

পাশাপাশি হাটে অতিরিক্ত হাসিল (টোল) আদায়, পকেটমার ও মলম পার্টির উপদ্রব, ক্রেতা-বিক্রেতাদের হঠাৎ অসুস্থতা এবং জাল টাকার চক্রের সক্রিয়তা মাঠপর্যায়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া যমুনাসেতু-টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়কে পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি বন্ধ করা জরুরি।

গবাদি পশু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন- এই সংকট থেকে দেশীয় খামারিদের রক্ষা, ক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাবনাময় এই খাতকে বাঁচাতে অবিলম্বে অন্তত ছয়টি সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন, চিকিৎসা ক্যাম্প ও ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠন, চোরাচালান রোধে কঠোর নজরদারি, হাসিল বা টোল আদায়ে সতর্কতা, জাল টাকা রোধে ব্যাংকের বুথ স্থাপন এবং হাইওয়ে ও পশুরহাটে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাতুলী ইউনিয়নের চৌ-বাড়িয়ায় রহমান এগ্রো ফার্মের মালিক দেওয়ান সুমন আহমেদ জানান, দিন দিন গো-খাদ্যের বাড়তি দামে খামারিরা হতাশায় ভুগছেন। গত বছর ঈদে তিনি ৩৮টি ষাঁড় গরু বিক্রি করেছেন। এবছরও ৩৪টি ষাঁড় গরু বিক্রির ইচ্ছে রয়েছে।

কালিহাতী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু সাইম আল সালাউদ্দিন জানান, এ উপজেলায় এক হাজার ৭০৩টি গরু ও ছাগলের খামার গড়ে উঠেছে। ২০ হাজার ৫৬৯টি পশু কুরবানির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চাহিদা রয়েছে ১৭ হাজার ৯৭১টি। এর মধ্যে উদ্বৃত্ত রয়েছে দুই হাজার ৫৯৮টি পশু।

সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান জানান, সদরে প্রান্তিক খামারিদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। এছাড়া পশুর হাটে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা ডা. মো. শহীদুল আলম জানান, ইতোমধ্যে জেলায় খামারিদের মানসম্পন্ন গরু-ছাগল উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ প্রশিক্ষণে লব্ধ জ্ঞান খামারিরা কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে।

টাঙ্গাইল জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হেলাল উদ্দিন খান জানান, জেলায় কুরবানির জন্য দুই লাখ ৩৩ হাজার ৯৯৩টি পশুর মধ্যে রয়েছে ষাঁড়, বলদ, গাভী, মহিষ, ছাগল, ভেড়াসহ অন্যান্য পশু। এবার কুরবানির জন্য চাহিদা রয়েছে এক লাখ ৯৫ হাজার ১৭৮টি পশু। উদ্বৃত রয়েছে ৩৯ হাজার ৯৮৩টি। ইতোমধ্যে জেলার স্থায়ী ও অস্থায়ী কুরবানির হাটগুলোতে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া খামারি, পাইকার ও খুচরা ক্রেতাদের সার্বিক নিরাপত্তায় যা যা প্রয়োজন সব ব্যবস্থাই করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *