ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অফিস সহকারী মিজানুরের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ অনুবিভাগে কর্মরত এক অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঘুষ-দুর্নীতি, প্রভাব খাটানো এবং নামে-বেনামে একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ভূমি অধিগ্রহণ অনুবিভাগের শাখা-৫–এ কর্মরত অফিস সহকারী মিজানুর রহমান (মিজান)। সরকারি চাকরিতে তুলনামূলক নিম্নপদে কর্মরত হলেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তাঁর বিপুল সম্পদের তথ্য স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ অনুবিভাগে মোট পাঁচটি শাখা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত নথি, ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন মিজানুর রহমান। সেই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানচন্দ্রিমা মডেল টাউন এলাকায় তাঁর নামে ও বেনামে একাধিক বহুতল ভবন রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ভবনের অধিকাংশই অত্যাধুনিক নকশায় নির্মিত এবং বাজারমূল্য কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত সম্পদের মধ্যে রয়েছে ঢাকা উদ্যানের ২ নম্বর রোডের ২৫ ও ২৭ নম্বর হোল্ডিংয়ে নির্মিত ‘কলেজ পার্ক’ নামের ১০ তলা অ্যাপার্টমেন্ট। অভিযোগ রয়েছে, এই ভবনের একটি রাজকীয় ফ্ল্যাটে সপরিবারে বসবাস করেন মিজান। ফ্ল্যাটটিতে ব্যয়বহুল ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা হয়েছে এবং স্থানীয়দের দাবি, এর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি টাকারও বেশি।

এতেই শেষ নয়। অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ঢাকা উদ্যানের ডি ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ১৪ ও ১৬ নম্বর হোল্ডিংয়ে নির্মিত ১০ তলা ‘আদর্শ নিবাস’, এ ব্লকের ২ নম্বর রোডের ৫৮ নম্বর হোল্ডিংয়ের ১২ তলা ‘ঢাকা উদ্যান সিটি সেন্টার’ ভবনের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া চন্দ্রিমা মডেল টাউনে ‘এভিনিউ পার্ক’, ‘মাধবীলতা’, **‘প্রত্যাশা প্যালেস’**সহ আরও একাধিক বহুতল ভবন তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

বর্তমানে ঢাকা উদ্যানের ৩ নম্বর রোডের ৬ নম্বর বাড়িসহ আরও কয়েকটি নতুন ভবনের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একটির কাজ শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি ভবনের নির্মাণ শুরু করেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিজানুর রহমান নিজেই জমি ক্রয় করে বহুতল ভবন নির্মাণ করেন। পরে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থায়ন করেন। অভিযোগ রয়েছে, নিজের নামে সম্পদের পরিমাণ কম দেখানোর জন্য বিভিন্ন শেয়ারহোল্ডারের নামে ফ্ল্যাট বা অংশবিশেষ রেজিস্ট্রি করে সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আড়াল করার কৌশলও অনুসরণ করেন।

নির্মাণাধীন একটি ভবনের দায়িত্বে থাকা ইসমাইল নামের এক ব্যক্তি জানান, “এই ১০ তলা ভবনের সব ফ্ল্যাট ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। এছাড়া মিজান স্যারের আরও সাত-আটটি বাড়ি রয়েছে।”

মিজানের অধিকাংশ ভবনের নির্মাণকাজ পরিচালনা করে আল-আমিন কন্ট্রাক্টর। ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং বিভিন্ন ভবনে কাজ করা সেনিটারি মিস্ত্রি জাহাঙ্গীর বলেন, “আমি মিজান স্যারের আট-নয়টি ভবনে কাজ করেছি। এখনো কয়েকটি ভবনের কাজ চলছে।” তিনি আরও জানান, একটি ভবনের নিচতলায় ১২টি দোকান রয়েছে, যেগুলো ভাড়া দিয়ে নিয়মিত আয় করছেন মিজান।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মিজানুর রহমান কলেজ পার্ক ভবনের ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তিনি দাবি করেন, এর বাইরে তাঁর উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পদ নেই।

অন্যদিকে, তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত রবিউল ইসলাম হুজুর জানান, মিজানের অধিকাংশ ভবনেই উন্নতমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

এদিকে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও উঠেছে নানা অভিযোগ। বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভোলা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলী আজম মুকুলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছিলেন মিজানুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক এই সংসদ সদস্যের অবৈধ অর্থের একটি বড় অংশ মিজানের নিয়ন্ত্রণে সংরক্ষিত ছিল।

এ বিষয়ে মিজানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি মোবাইল ফোনে খুদে বার্তায় সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে লেখেন, “আপনি তদন্ত করেন।”

সরকারি চাকরির একটি নিম্নপদে থেকে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ, কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে ইতোমধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ভূমি অধিগ্রহণের মতো সংবেদনশীল শাখায় দায়িত্ব পালনকালে গড়ে ওঠা কথিত ঘুষের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব সম্পদ অর্জিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। একই সঙ্গে মিজানুর রহমানের সম্পদের উৎস, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, নামে-বেনামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে।

এ বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। পরবর্তী পর্বে মিজানুর রহমানের সম্পদের উৎস, ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় তাঁর কথিত প্রভাববলয়, আর্থিক লেনদেন এবং অন্যান্য অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *