আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
রাশিয়ার প্রখ্যাত জ্যাজশিল্পী ইগর বুটম্যানের নেতৃত্বে গঠিত ‘ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ জ্যাজ টিম’ আন্তর্জাতিক যুব উৎসবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ জ্যাজশিল্পীদের নিয়ে বিশেষ পরিবেশনা করেছে।বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবুর্গের চাইকোভস্কি কনসার্ট হলে অনুষ্ঠিত গালা কনসার্টে ইগর বুটম্যান ও তরুণ শিল্পীরা অংশ নেন। এতে রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা, বেলারুশ, কিউবা, উজবেকিস্তান, আর্মেনিয়া ও কাজাখস্তানের শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন।বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের সম্মিলিত পরিবেশনায় জ্যাজের আন্তর্জাতিক ভাষা ফুটে ওঠে। আয়োজকদের মতে, সংগীত ভৌগোলিক সীমান্ত অতিক্রম করে মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সংলাপের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ আয়োজন তারই একটি উদাহরণ।ইগর বুটম্যান জানান, এ ধরনের আন্তর্জাতিক দল নিয়ে কাজ করা তাঁদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই উদ্যোগ নতুন বন্ধুত্ব ও সৃজনশীল বিনিময়ের পথ উন্মোচন করবে। পাশাপাশি শিল্পীরা নিজ নিজ দেশেও এ ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন।বুটম্যান বলেন, দলের প্রতিটি শিল্পী অসাধারণ এবং তাঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব পরিবেশনাশৈলী রয়েছে। এই বৈচিত্র্যই দলটিকে আরও শক্তিশালী করেছে।কনসার্টে ইগর বুটম্যানের পরিচালনায় রাশিয়ার মস্কো জ্যাজ অর্কেস্ট্রা অংশ নেয়। তাঁদের সঙ্গে পরিবেশন করেন চীনের পিয়ানোবাদক এ বু, তুরস্কের কণ্ঠশিল্পী আইয়ুল এরগেল, দক্ষিণ আফ্রিকার কণ্ঠশিল্পী জো মোদিগা, উজবেকিস্তানের স্যাক্সোফোনবাদক দোনিয়োর রিজায়েভ, আর্মেনিয়ার ট্রাম্পেটবাদক তিগরান আরুতিউনিয়ান, কাজাখস্তানের ট্রাম্পেটবাদক সাতেন নুরমুখামেদ এবং বেলারুশের স্যাক্সোফোনবাদক ম্যাক্সিম বাখার।তরুণ শিল্পীদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বুটম্যান বলেন, নতুন কিছু করার প্রতি তরুণ সংগীতশিল্পীদের আগ্রহ প্রবল। তাঁদের সঙ্গে বাজানো সব সময় আনন্দদায়ক ও রোমাঞ্চকর।জ্যাজের ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, একসময় কেউ কেউ জ্যাজের অবসানের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে আরও বেশি সংগীতশিল্পী এই ধারায় আসছেন এবং বিভিন্ন দেশে জ্যাজ উৎসবের সংখ্যা বাড়ছে। তরুণদের এ ধারায় যুক্ত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।বুটম্যানের ভাষ্য, কনসার্টে অংশ নেওয়া শিল্পীরা বয়সে তরুণ হলেও শিক্ষানবিশ নন। তাঁরা ইতিমধ্যে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।কনসার্টে প্রচলিত জ্যাজের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত সুরও পরিবেশন করা হয়। রুশ সুরকার মদেস্ত মুসর্গস্কির অপেরা ‘খোভানশ্চিনা’র ‘দ্য ইয়াং ওয়ান ওয়াজ এক্সিটিং’ সুরের ওপর তাৎক্ষণিক জ্যাজ ইম্প্রোভাইজেশন করেন শিল্পীরা। এ ছাড়া ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার্স অব বুরাতিনো’ চলচ্চিত্রের বুরাতিনোর গানও পরিবেশন করা হয়।অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা নিজেদের দেশের সংগীত ঐতিহ্যের ছোঁয়া থাকা মৌলিক রচনাও পরিবেশন করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার গায়িকা জো মোদিগা এ অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষ একটি গান তৈরি করেন। গানটি নারীর অধিকার নিয়ে লেখা বলে তিনি জানান।জো মোদিগা বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার সংগীত ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সেখানে ধ্রুপদি সংগীত, জ্যাজ ও ডিজিটাল সংগীতের বিভিন্ন ধারা বিদ্যমান।চীনের পিয়ানোবাদক এ বু জানান, রাশিয়ায় এটি তাঁর ষষ্ঠ পরিবেশনা। তবে মস্কোর বাইরে এবারই প্রথম তিনি পরিবেশন করলেন। বিভিন্ন দেশের ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সংগীতভিত্তিক অভিজ্ঞতার শিল্পীদের এক মঞ্চে নিয়ে আসায় এ কনসার্ট তাঁর কাছে বিশেষ আয়োজন।বুটম্যান জানান, এ বুর সঙ্গে তাঁর পরিচয়ও বেশ পুরোনো। বহু বছর আগে প্যারিসে প্রথম তাঁর পরিবেশনা শুনেছিলেন তিনি। মাত্র আট বছর বয়সে এ বু বেইজিং কনজারভেটরি অব মিউজিকে ভর্তি হন। পরে তিনি নিউইয়র্কের জুলিয়ার্ড স্কুলে পড়াশোনা করেন।কনসার্টের আগের দিন আন্তর্জাতিক যুব উৎসবের অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন ইগর বুটম্যান। সেখানে সোভিয়েত ও রুশ জ্যাজের ইতিহাস, সমসাময়িক জ্যাজের চিত্র এবং তরুণদের এ সংগীতধারায় আকৃষ্ট করার বিষয়ে আলোচনা হয়। রাশিয়ায় তিন বছর আগে জ্যাজের শতবর্ষ পূর্তি উদ্যাপনের বিষয়টিও সেখানে উল্লেখ করা হয়।বুটম্যান বলেন, আন্তর্জাতিক এ ধরনের আয়োজনে তিনি সব সময় নতুন কিছু আবিষ্কার করেন। জ্যাজে ইম্প্রোভাইজেশন অন্যতম ভিত্তি। তাই এ ধারাকে সমর্থন ও বিকশিত করা প্রয়োজন।বিভিন্ন দেশে এ ধরনের আন্তর্জাতিক সংগীতদলের কনসার্ট আয়োজনেরও পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, এতে অংশগ্রহণকারীরা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজ নিজ দেশেও এ ধরনের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে পারেন। সংগীতের মাধ্যমে বিশ্বের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সংলাপ আরও জোরদার করা সম্ভব।‘যুব ও শিশু’ জাতীয় প্রকল্পের আওতায় ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক যুব উৎসব ১১ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবুর্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ‘স্বপ্নকে অনুসরণ করো’ স্লোগানে আয়োজিত এ উৎসবের বিষয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর একটি ডিক্রি জারি করেন।এবারের উৎসবে বিশ্বের ১৯১টি দেশের ১০ হাজার তরুণ নেতা অংশ নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৫ হাজার রাশিয়ার এবং ৫ হাজার বিদেশি নাগরিক। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সৃজনশীল শিল্প ও সংস্কৃতি, সরকারি প্রশাসন, বিজ্ঞান ও শিক্ষা, ক্রীড়া, উদ্যোক্তা, গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং নাগরিক কর্মকাণ্ডের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।