মোঃআনজার শাহ
কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশীর আহমেদ কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়েছিলেন বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগ ঘুরে দেখে রোগীসেবার মান, পরিবেশ ও অবকাঠামো নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন তিনি। পরিদর্শন শেষে স্বাধীন সংবাদের প্রতিবেদক আনজার শাহকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা।
হাসপাতাল চত্বর পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশনা,
সিভিল সার্জন জানান, হাসপাতালের মূল ফটকে গড়ে ওঠা বেশ কিছু দোকানে অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি হওয়ায় রোগীরা অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজেদুর রহমানকে আইনি সহায়তা নিয়ে দোকানগুলো অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতাল আঙিনায় ডাবের খোসা ও খাদ্যদ্রব্যের প্যাকেটের কারণে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি এড়াতে খোসাযুক্ত ফল হাসপাতাল চত্বরে না আনার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
তিনি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ, তাই হাসপাতাল প্রাঙ্গণ সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি। তিনি আরও জানান, মাননীয় প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমান দেশের প্রতিটি হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন, আর সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নেই এই আকস্মিক পরিদর্শন।
ভবনের গায়ে গজিয়ে ওঠা গাছপালা কেটে ফেলারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি এবং প্রতিটি বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকদের মধ্যে নির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে যেমন প্যাথলজি বিভাগ দেখভাল করবে গাছ অপসারণের কাজ, আর ইমারজেন্সি বিভাগ দায়িত্ব নেবে খাবারের মান তদারকির।
ইমারজেন্সিকে মডেল বিভাগে রূপান্তরের উদ্যোগ,
হাসপাতালের জরুরি বিভাগ পরিদর্শনকালে একে একটি মডেল ইমারজেন্সি হিসেবে গড়ে তুলতে ডা. সাজেদুর রহমানকে বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দেন সিভিল সার্জন। প্রতিদিন সকালে সাত থেকে আটশ রোগী দেখা হচ্ছে জেনে তিনি একে ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্যাথলজি বিভাগে দ্রুত রিপোর্ট প্রদানের নির্দেশ,
প্যাথলজি বিভাগে বিপুলসংখ্যক রক্ত পরীক্ষা হতে দেখে তিনি নির্দেশ দেন, দুপুর বারোটার মধ্যে সংগৃহীত নমুনার রিপোর্ট সেদিনই দিতে হবে, যাতে রোগীরা দ্রুত সেবা পান। রোগীর চাপ বেশি থাকায় বারোটার পরের নমুনার রিপোর্ট পরদিন দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে মান বজায় থাকে।
খাবারের মান ভালো, তবে রান্নাঘর সংস্কারের নির্দেশ,
পরিদর্শনে হাসপাতালের খাবারের মান সন্তোষজনক পাওয়া গেলেও রান্নাঘরের অবস্থা ভালো না থাকায় দ্রুত সংস্কারের নির্দেশ দেন সিভিল সার্জন।
ভর্তি রোগীদের সম্পূর্ণ সরকারি সুবিধা নিশ্চিতের নির্দেশ,
১৪ জুলাই পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি থাকা ২৮ জন রোগীকে সরকারিভাবে সম্পূর্ণ চিকিৎসা সুবিধা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই হাসপাতালে প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৪০টি সিজারিয়ান অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে, যা প্রসূতিসেবার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক অর্জন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
১০১ শয্যায় উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা,
সিভিল সার্জন জানান, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ধাপে ধাপে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। তার মতে, বরুড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এই মানে উন্নীত হওয়ার মতো উপযুক্ত অবকাঠামো ও অবস্থানে রয়েছে।
দুই মাসের মধ্যে চালু হতে পারে নতুন এ কে এম আবু তাহের ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল,
প্রতিবেদক আনজার শাহের প্রশ্নের জবাবে সিভিল সার্জন জানান, এ কে এম আবু তাহের ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের অবকাঠামোগত কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে এবং জনবল নিয়োগও দেওয়া হয়েছে। বাজেট ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তালিকাও প্রস্তুত করে পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসক নিয়োগ সম্পন্ন হলে এবং কিছু জনবল ইতিমধ্যে বরুড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত থাকায়, আশা করা হচ্ছে আগামী দুই মাসের মধ্যেই হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব হবে।
হাসপাতালের চিকিৎসকের প্রতিক্রিয়া,
আকস্মিক এই পরিদর্শন প্রসঙ্গে ডা. সাজেদুর রহমান বলেন, স্যার কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই হাসপাতাল পরিদর্শনে চলে এসেছেন, যা প্রমাণ করে তিনি সবসময় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর তদারকিতে সদা তৎপর।
তিনি আরও জানান, এই হাসপাতালে একাধিক অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কর্মরত আছেন, বিশেষ করে গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. শাহনাজের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও দক্ষ চিকিৎসক, এমনকি ব্যক্তিগতভাবে নিজের পরিবারের সদস্যদেরও তিনি তার কাছেই চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান।
হাসপাতালের আধুনিক মেশিনপত্র প্রসঙ্গে ডা. সাজেদুর রহমান বলেন, এখানে যে মানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি রয়েছে, তা অন্য অনেক জায়গায় বিরল। তাই তিনি এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বাড়তি খরচ না করে সরকারি এই সেবা গ্রহণ করতে, যাতে মানসম্মত চিকিৎসা স্বল্প খরচে সবার কাছে পৌঁছায়।
সার্বিকভাবে সিভিল সার্জনের এই আকস্মিক পরিদর্শন ও দিকনির্দেশনা বরুড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মান আরও উন্নত করার পাশাপাশি এলাকাবাসীর জন্য একটি স্বস্তির খবর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।