মোঃ আনজার শাহ:
জাতীয় সংসদের করিডোরে করিডোরে ঘুরে, সহকর্মী সংসদ সদস্যদের কাছে গিয়ে নিজ হাতে সম্মতির স্বাক্ষর সংগ্রহ করছেন একজন মন্ত্রী,দৃশ্যটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুব একটা চোখে পড়ে না। অথচ কুমিল্লাকে পূর্ণাঙ্গ বিভাগে রূপান্তরের লক্ষ্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এমপি ঠিক এই কাজটিই করছেন বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এমপি।
কুমিল্লা জেলার আইনশৃঙ্খলা ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এ তথ্য জানান।
এমন উদ্যোগ আগে দেখিনি:সংবাদ সম্মেলনে ডা. তাহের বলেন, কুমিল্লার উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিতে বর্তমানে যে সমন্বিত প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তেমনটি অতীতে তিনি প্রত্যক্ষ করেননি। জেলার বর্তমান তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি তাঁকে অভিজাত, জ্ঞানী, আন্তরিক ও গভীর দায়িত্ববোধসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করেন। পাশাপাশি কুমিল্লার দায়িত্ব অর্পণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
জুলাই সনদেই ছিল কুমিল্লা বিভাগের প্রতিশ্রুতি:কুমিল্লা বিভাগ গঠনের পটভূমি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডা. তাহের জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জুলাই সনদ প্রণয়নের আলোচনায় বাংলাদেশে দুটি নতুন বিভাগ-কুমিল্লা ও ফরিদপুর-প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতাতেই গৃহায়ণমন্ত্রী স্বয়ং উদ্যোগ নিয়ে সংসদ সদস্যদের ২৯ জনের মধ্যে ২৪ জনের কাছ থেকে সরাসরি সম্মতি আদায় করছেন বলে তিনি জানান।
বিভাগ বাস্তবায়নের উদ্যোগে সংসদ সদস্যদের সমর্থনের প্রসঙ্গ তুলে জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, “আমি তখন কুমিল্লার দায়িত্বে ছিলাম না। তবুও কুমিল্লা বিভাগের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আমি স্বাক্ষর দিয়েছি।”
তিনি বলেন, কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নের প্রশ্নে ব্যক্তিগত দায়িত্বের সীমারেখার ঊর্ধ্বে উঠে সমর্থন জানানো হয়েছে। কুমিল্লার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে এ ধরনের ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
ডা. তাহের স্মরণ করিয়ে দেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়ও জেলার সব সংসদ সদস্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। বিভাগ বাস্তবায়নের এই যাত্রায়ও সংসদের হুইপ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর নেতৃত্বে জেলার সব সংসদ সদস্য একত্রে বসে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কুমিল্লায় মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু:
একই সভায় গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের জানান, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এলাকায় মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ১৮টি উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা দেশের সবচেয়ে বড় জেলা হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে। মন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেন, দেশের অনেক সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যেই মেট্রোপলিটন পুলিশ পেলেও, ১৪-১৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এই সুবিধা থেকে এখনো বঞ্চিত।
বিগত সরকারের আমলে এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও কুমিল্লায় মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে উপলব্ধি করছেন। দ্রুত এটি চালু হলে ১৮টি উপজেলার আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সুপারের ওপর চাপ কমবে, জনবল বাড়বে এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিভাগের নামে আঞ্চলিক বিদ্বেষ কাম্য নয়:
সভায় বক্তব্য রাখেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহও। তিনি সতর্ক করে বলেন, কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের আঞ্চলিক বিদ্বেষ ছড়ানো উচিত নয়। কুমিল্লা ও নোয়াখালীর মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও আত্মীয়তার বন্ধন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভাগ গঠনকে ঘিরে দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে কোনো বিরোধ বা বিভাজন তৈরি হওয়া কারও কাম্য নয়।
ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় আশার আলো:
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত বক্তারা বলেন, কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত বিভাগ বাস্তবায়নে সরকার, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। জেলার সব সংসদ সদস্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে এবং সরকারের আন্তরিকতা অব্যাহত থাকলে শিগগিরই কুমিল্লা বিভাগ পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করবে বলে তাঁরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও দৃশ্যমান উন্নতি ঘটবে বলে প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান, কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়া, কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. জসীম উদ্দীন, কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী এবং কুমিল্লা-৭ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুল ইসলাম শাওনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।