পিরোজপুরে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম চাপে সাধারণ ক্রেতারা

জেলা প্রতিনিধি:

পিরোজপুরের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। শীতকালীন সবজির সরবরাহ কম থাকায় বেশির ভাগ সবজির দাম এখনো তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে, মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার কারণে বাজারে মাছের সরবরাহ কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। চাল, ডাল, তেল ও ডিমের দামও বেড়েছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষকে সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

ক্রেতাদের অভিযোগ, আয় না বাড়লেও নিত্যপণ্য কিনতে ব্যয় বাড়ছে। মাছের পরিবর্তে সবজি কিংবা সবজির পরিবর্তে ডিম কিনে খরচ কমানোর চেষ্টা করেও স্বস্তি মিলছে না। এ পরিস্থিতিতে বাজার মনিটরিং জোরদার করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

রোববার (২৫ অক্টোবর) পিরোজপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, চালের দাম দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলক বেশি। গত তিন মাসে সয়াবিন তেল, ডিম ও রসুনের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া নদীতে মাছ ধরার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে বাজারে মাছের সরবরাহ কমেছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। শীতকালীন সবজি ফুলকপি, শিম, টমেটো ও কাঁচামরিচের দামও ক্রেতাদের নাগালের বাইরে বলে মনে করছেন অনেকে।

চাল-ডিম-তেলের দামেও বাড়তি চাপ

বাজারে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২০৪ টাকায়। তিন মাস আগে এর দাম ছিল ১৯৯ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি লিটারে দাম বেড়েছে পাঁচ টাকা।

ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে চালের বাজারেও। তাঁদের হিসাবে, গত কয়েক মাসে চালের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। বর্তমানে পোলাওয়ের চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৯০ টাকায়। সাধারণ ভাতের চালের দাম প্রকারভেদে ৫০ থেকে ৭০ টাকা।

ডিমের দামও বেড়েছে। তিন মাস আগে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম প্রতি হালি ছিল ৪০ থেকে ৪২ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে ৪৮ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হাঁসের ডিমের হালি ৬৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৫ টাকা।

পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ৪৫ টাকা। রসুনের দামও গত তিন মাসে ৬৫ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা হয়েছে।

মসুর ডালের ক্ষেত্রেও দেশি ও আমদানি করা ডালের দামে পার্থক্য রয়েছে। আমদানি করা মসুর ডাল পাইকারিতে ৮২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে দাম ৯০ টাকা। দেশি মসুর ডাল পাইকারিতে ১৪৮ থেকে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

মাছের সরবরাহ কম দাম বেড়েছে

ব্যবসায়ীদের দাবি, মাছের সরবরাহ কম থাকায় ঘেরের মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে আকারভেদে রুই মাছ ২৮০ থেকে ৩৩০ টাকা, কোরাল ৭০০ থেকে ৮৫০ টাকা, চিংড়ি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং কই মাছ কেজিপ্রতি ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

পিরোজপুর বাজারের মাছ ব্যবসায়ী মো. আলম শেখ বলেন, নদীতে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাজারে মাছ কম আসছে। ঘেরের মাছেরও দাম বেশি। এসব মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

মাছের বাজারে চাপ থাকলেও মুরগির দামে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৮০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩২০ টাকা, লাল মুরগি ৩৭০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, তিন মাস আগে এসব মুরগির দাম বর্তমান দামের তুলনায় কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি ছিল।

গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, এ দুই ধরনের মাংসের দামে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি।

সবজির দামেও স্বস্তি নেই

পিরোজপুরের বাজারে বর্তমানে টমেটো কেজিপ্রতি ১৬০ টাকা, ফুলকপি ১০০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা, শালগম ১২০ টাকা, লেবু ৩৫ টাকা, করলা ৬০ টাকা, গাজর ১৬০ টাকা, বাঁধাকপি ৬০ টাকা, শিম ১৪০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা, পটোল ৫০ টাকা, লাউ ৫০ টাকা, পাতাকপি ৬০ টাকা, মুলা ৫০ টাকা এবং শসা ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচের দাম কেজিপ্রতি ১২০ টাকা।

স্থানীয় ক্রেতাদের দাবি, গত কয়েক মাস ধরেই সবজির দাম তুলনামূলক বেশি। গত ২ অক্টোবর বাজারে বেগুনের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, করলা ৭০ থেকে ৯০ টাকা, পটোল ৫০ থেকে ৭০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৬০ থেকে ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং কাকরোল ৮০ থেকে ৯০ টাকা। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের ব্যবধানে তখন অধিকাংশ সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল।

সবজি ব্যবসায়ী রাতুল বলেন, শীতকালীন সবজি পুরোদমে বাজারে উঠলে দাম কমে আসবে। এখন সরবরাহ কম থাকায় কিছু সবজির দাম বেশি। তবে কিছু সবজির দাম আবার কমেছে বলেও জানান তিনি।

ক্রেতাদের ক্ষোভ বাজার তদারকি জোরদারের দাবি

বাজার করতে আসা ফাহিম ইসলাম বলেন, সবকিছুর দাম দিন দিন বাড়ছে। চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে না, অথচ বাজারে প্রতিটি পণ্য কিনতে বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।

আজিজুল নামে আরেক ক্রেতা বলেন, বাজারের দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। সবজি কিনতে গেলেও ৬০ থেকে ৭০ টাকার নিচে ভালোভাবে কিছু পাওয়া যায় না। চাল ও তেলের বাড়তি দামও সংসারের ব্যয় বাড়াচ্ছে।

পিরোজপুর কাঁচাবাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক জালিস মাহমুদ বলেন, চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে গত সপ্তাহের তুলনায় সবজির দাম কিছুটা কমেছে। মরিচ, বেগুন, পটোল ও লাউয়ের দাম কমেছে বলে জানান তিনি। শীতকালীন কিছু সবজি বাজারে আসতে শুরু করেছে। সরবরাহ বাড়লে দাম আরও কমবে বলে আশা করছেন তিনি।

পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম বলেন, ক্রেতারা যাতে ন্যায্যমূল্যে পণ্য কিনতে পারেন, সে জন্য উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজার তদারকি করা হচ্ছে। কোনো অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। সামনে বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *