পূর্ব দোলাইরপাড়ে মাদকের রমরমা, অভিযোগের পরও নীরব থানা

স্টাফ রিপোর্টার:

রাজধানীর কদমতলী থানার পূর্ব দোলাইরপাড় এলাকায় মাদক ব্যবসা ও মাদকসেবীদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘পূর্ব দোলাইরপাড় ঐক্য পরিষদ’-এর পক্ষ থেকে কদমতলী থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও অভিযোগের পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

সংগঠনটির অভিযোগ, পূর্ব দোলাইরপাড়ের বিভিন্ন গলিতে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা ও মাদক সেবন চলছে। মাদকের কারণে এলাকায় চুরি, মারামারি, বিশৃঙ্খলা ও বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাদের ভয়ভীতি দেখানো, মারধর ও জীবননাশের হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকের কারণে সন্ধ্যার পর থেকে এলাকার বিভিন্ন গলিতে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ায় অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চললেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় মাদক ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে দাবি তাদের।

সভা করে থানায় লিখিত অভিযোগ

‘পূর্ব দোলাইরপাড় ঐক্য পরিষদ’ জানায়, এলাকায় মাদকের বিস্তার বন্ধ ও মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে গত ১৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে সংগঠনের কার্যালয়ে নির্বাহী পরিষদ, উপদেষ্টা পরিষদ ও স্থানীয় এলাকাবাসীর সমন্বয়ে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় এলাকায় মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। পরে সংগঠনের পক্ষ থেকে গত ২৮ জুলাই কদমতলী থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।

অভিযোগপত্রে পূর্ব দোলাইরপাড়ের বিভিন্ন গলিতে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৫ জনের নাম ও ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে যাদের নাম-ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে

পূর্ব দোলাইরপাড় ঐক্য পরিষদের দেওয়া অভিযোগপত্র অনুযায়ী, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন—

১. অনিক — অভিযোগপত্রে তার বাবার নাম বা পূর্ণ ঠিকানা উল্লেখ করা হয়নি। ২. অমিত — পিতা: তমিজ উদ্দিন তমু; ঠিকানা: ১৮৪, পূর্ব দোলাইরপাড়, ১ম গলি। ৩. রানা ওরফে কসাই রানা — পিতা: মৃত নুরুল্লা নুরু; ঠিকানা: ২৮৪, পূর্ব দোলাইরপাড়, ৩য় গলি। ৪. মামুন — পিতা: মৃত আশ্রাফ মৃধা; ঠিকানা: ২০৪, পূর্ব দোলাইরপাড়, ১ম গলি। ৫. বাবা রাসেল — পিতা: অজ্ঞাত; ঠিকানা: পূর্ব দোলাইরপাড়, ৩য় গলি। ৬. সালাউদ্দিন সালু — পিতা: খোকা; ঠিকানা: ২৬৪, পূর্ব দোলাইরপাড়, ৩য় গলি। ৭. আল আমিন — পিতা: মৃত বিল্লাল; ঠিকানা: ২৭৪/১, পূর্ব দোলাইরপাড়, ৩য় গলি। ৮. ইয়াসিন — পিতা: ফজল ওরফে বল্লা; ঠিকানা: শাহ আলম পাটোয়ারীর বাড়ি, নিচতলা, পূর্ব দোলাইরপাড়, ৩য় গলি। ৯. নাহিদ — পিতা: এটিএম আবুন; ঠিকানা: ২৫৭, পূর্ব দোলাইরপাড়, ২য় গলি। ১০. সোহেল — পিতা: মৃত আউয়াল; ঠিকানা: আউয়াল সাহেবের বাড়ি, পূর্ব দোলাইরপাড়, ১ নম্বর গলি। ১১. সোহাগ — পিতা: মৃত আউয়াল; ঠিকানা: আউয়াল সাহেবের বাড়ি, পূর্ব দোলাইরপাড়, ১ নম্বর গলি। ১২. মাহিন — পিতা: রুবেল; ঠিকানা: ২৭০, পূর্ব দোলাইরপাড়, ৩য় গলি। ১৩. আল আমিন (মেয়ে ছেলে নামে উল্লেখিত) — পিতা: অজ্ঞাত; ঠিকানা: সাকিল-ওয়াকিলদের বাড়ি, নিচতলা, পূর্ব দোলাইরপাড়, ১ম গলি। ১৪. সুমি — পিতা: রহিম; ঠিকানা: ২১৩/১, পূর্ব দোলাইরপাড়, ১ নম্বর গলি। ১৫. মারুফ — পিতা: মনির; পরিচিতি হিসেবে অভিযোগে ‘সোহেল বাবুর্চির ভাগিনা’ উল্লেখ করা হয়েছে; ঠিকানা: পূর্ব দোলাইরপাড়, ৩য় গলি।

অভিযোগের পরও ব্যবস্থা নেই, দাবি সংগঠনের

পূর্ব দোলাইরপাড় ঐক্য পরিষদের দাবি, থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও মাদক ব্যবসা বন্ধে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং অভিযোগ দেওয়ার পরও এলাকায় মাদক ব্যবসা আগের মতোই চলছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

বিষয়টি নিয়ে কদমতলী থানার ওসি (তদন্ত)-এর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “মাদক ব্যবসায়ী ধরা আমাদের দায়িত্ব নয়, এটা মাদক অধিদপ্তর বুঝবে।”

ওসি (তদন্ত)-এর এমন বক্তব্যের পর স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—কোনো এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসার অভিযোগ থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগের পর কেন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

‘মাদক ব্যবসায়ীদের না ধরে স্পট থেকে লোক আটক’—অভিযোগ

এদিকে স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় কথিত মাদক ব্যবসায়ীদের আটক না করে ঘটনাস্থলে থাকা একাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। পরে তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

তবে অর্থের বিনিময়ে কাউকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগটির স্বাধীন তদন্ত ছাড়া এর সত্যতাও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ার পরও যদি প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয় এবং অভিযানের সময় অন্য ব্যক্তিদের আটক করে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে এর পেছনে কারা দায়ী—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি। একটি এলাকায় মাদকের বিস্তার ঘটলে শুধু মাদকসেবীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; এর প্রভাব পড়ে পরিবার, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ওপরও। মাদককে কেন্দ্র করে চুরি, ছিনতাই, মারামারি ও অন্যান্য অপরাধ বাড়ার আশঙ্কাও থাকে।

তাই পূর্ব দোলাইরপাড়ে মাদক ব্যবসার অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তারা সত্যিই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে।

পূর্ব দোলাইরপাড় ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দারা ঐক্যবদ্ধ। লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এলাকার মানুষ হতাশ হয়ে পড়বে। তিনি মাদক ব্যবসার সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিরীহ কাউকে হয়রানি না করার দাবি জানান।

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, কদমতলী থানা ও সংশ্লিষ্ট মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করবে। মাদক ব্যবসার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং অভিযানের নামে কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *