মোঃআনজার শাহ
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল পাঠদানই করে না; গড়ে তোলে স্বপ্ন, সৃষ্টি করে নেতৃত্ব, জাগিয়ে তোলে আত্মবিশ্বাস। আর সেই স্বপ্ন যখন একদিন জাতীয় নেতৃত্ব ও তরুণ উদ্ভাবকদের একই মঞ্চে মিলিত করে, তখন তা ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এমনই এক অনন্য মুহূর্তের সাক্ষী হয় দেশ। আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স প্রতিযোগিতা RoboSub–২০২৬-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাওয়া ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের একদল মেধাবী শিক্ষার্থী সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের-এর সঙ্গে।
সাগরের অতল গহ্বরে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার নতুন ইতিহাস রচনার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রার আগে দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা, শুভকামনা ও অনুপ্রেরণা গ্রহণের এই মুহূর্ত শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন ছিল স্মরণীয়, তেমনি দেশের বিজ্ঞানমনস্ক তরুণ প্রজন্মের জন্যও ছিল এক আশাবাদের বার্তা।
সাক্ষাৎকালে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবিত পানির নিচে পরিচালিত স্বয়ংক্রিয় রোবোটিক প্রযুক্তির প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করেন। প্রকল্পের নকশা, প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য, গবেষণার ধাপ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি সম্পর্কে গভীর আগ্রহ নিয়ে জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। তরুণদের সৃজনশীলতা, গবেষণামনস্কতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রশংসা করে তিনি বলেন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনই আগামী বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, নিষ্ঠা, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে এগিয়ে যেতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা আরও উঁচুতে তুলে ধরতে তরুণদের এমন উদ্যোগই একদিন দেশের গর্ব হয়ে উঠবে। উদ্ভাবনী গবেষণায় সরকার সবসময় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
আন্তরিক এই মতবিনিময়ের একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর রচিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বইটি শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেন। ভবিষ্যৎ পথচলায় দেশপ্রেম, জ্ঞানচর্চা এবং মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আবেগঘন দিক ছিল একটি বিরল মিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের—দুজনেই ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। একই শিক্ষাঙ্গনের দুই কৃতী সন্তান যখন নিজেদের প্রতিষ্ঠানের বর্তমান শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক সাফল্যের পথে উৎসাহ দিতে একসঙ্গে দাঁড়ালেন, তখন পুরো আয়োজন যেন গর্ব, আবেগ এবং প্রেরণার এক অনন্য প্রতীকে পরিণত হয়।
উপস্থিত অনেকের মতে, এটি শুধু একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে স্বপ্ন, দায়িত্ব এবং নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার প্রতীকী মুহূর্ত।
আগামী ১১ থেকে ১৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পানির নিচের রোবোটিক্স প্রতিযোগিতা RoboSub–২০২৬। সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থীদের দল ‘প্রজেক্ট পসাইডন’স কোড’।
দলটির সদস্যরা জানান, এটি বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আন্ডারওয়াটার রোবোটিক্স উদ্যোগ, যার যাত্রা শুরু হয় ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের হাত ধরে। বর্তমানে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রোবোটিক্স (UIU-CAIR)-এর প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় প্রকল্পটি আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানির নিচের স্বয়ংক্রিয় রোবোটিক প্রযুক্তি ভবিষ্যতে সমুদ্র গবেষণা, নৌ-নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সেই সম্ভাবনার দিগন্তে বাংলাদেশের তরুণদের এই পদচারণা নিঃসন্দেহে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দুই প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং একদল স্বপ্নবাজ তরুণ—এই তিনের মিলনে রচিত হলো অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল অধ্যায়। আজকের এই সাক্ষাৎ হয়তো একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি; কিন্তু এর অন্তর্নিহিত বার্তা আরও গভীর—স্বপ্ন দেখতে জানলে, পরিশ্রমকে সঙ্গী করলে এবং দেশকে হৃদয়ে ধারণ করলে বিশ্বমঞ্চেও বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে আনা সম্ভব।