জেলা প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার পাইন্দং ইউনিয়নের উত্তর পাইন্দং ৭ নম্বর ওয়ার্ডে খালেদা কালাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে প্রকাশ্যে টিলা কেটে সাবাড় করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাইন্দং আমতল থেকে পূর্ব দিকে প্রায় পাঁচ একর আয়তনের রাবার বাগানসংলগ্ন লাল টিলা কেটে সেখানে পাকা ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। এর আগে প্রশাসনের অভিযান ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হলেও ফের টিলা কাটার ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। এতে পরিবেশ সংরক্ষণে প্রশাসনের নজরদারি ও আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ঘটনায় মোহাম্মদ শওকত ও তাঁর ছেলে ইরতিসাম কালাম ইরসালের নাম উঠে এসেছে। তাঁরা পাইন্দং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রশাসনের পূর্ববর্তী অভিযান ও জরিমানার পরও টিলা কাটার কাজ বন্ধ হয়নি।
টিলা কাটার বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোহাম্মদ শওকতের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিককে বলেন, ‘সাংবাদিক ও প্রশাসন ম্যানেজ হয়ে গেছে। টাকা খেয়েছে। আপনি কে? যা করতে পারেন করেন!’ এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘আমি কে চিনেন? আমার ভাই চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেন।’
শুধু তাই নয়, টিলা কাটার বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাঁকে অনুমতি দিয়েছেন বলেও দাবি করেন শওকত। তবে তাঁর এ দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টিলা কাটার অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
এ বিষয়ে ফটিকছড়ি উপজেলা সহকারী ভূমি কর্মকর্তা রহমত উল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এর আগে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছিলেন। এরপর পুনরায় টিলা কাটার বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, টিলা কাটার অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
প্রশাসনের অভিযান ও জরিমানার পরও কীভাবে একই স্থানে আবার টিলা কাটার কাজ চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পূর্ববর্তী অভিযানের পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং জরিমানার পরও যদি একই ধরনের অপরাধ পুনরায় ঘটে, তাহলে আইন প্রয়োগ ও নজরদারির কার্যকারিতা কোথায়—এমন প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
ঘটনাটি সম্পর্কে বক্তব্য জানতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ফটিকছড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক মাঈনুদ্দিনকে একাধিকবার ফোন ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মুজাহিদুর রহমানকে ফোনে বিষয়টি জানানো হলে তিনি ঘটনাস্থলে লোক পাঠিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
এদিকে, রাবার বাগানসংলগ্ন টিলা কাটার বিষয়ে কাঞ্চননগর বাগানের (বিএফআইডিসি) ব্যবস্থাপক তপন কর্মকারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৬খ ধারায় সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কাটা বা মোচনের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আইনটির ১৫ ধারার দণ্ডসংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী, ৬খ ধারা লঙ্ঘনের প্রথম অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। একই অপরাধ পুনরায় সংঘটিত হলে দুই থেকে দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা দুই থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এ ছাড়া ১৫খ ধারায় অপরাধে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, যানবাহন ও সংশ্লিষ্ট সামগ্রী বাজেয়াপ্ত বা বিনষ্টের বিষয়ে আদালতের আদেশ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ, জরিমানা দিয়েই বারবার টিলা কাটার কোনো আইনগত বৈধতা নেই। বরং অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে আইন অনুযায়ী আরও কঠোর দণ্ডের বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, প্রশাসনের অভিযান ও জরিমানার পরও যদি টিলা কাটা বন্ধ না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে আইনের কার্যকারিতা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে? স্থানীয় কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে দেশে আইন ও প্রশাসন টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যায়, সে দেশে যেকোনো কিছু হওয়া সম্ভব।’ তবে প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে অভিযুক্তদের সহায়তা করেছেন কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়। অভিযুক্তের ‘প্রশাসন ম্যানেজ’ ও ‘টাকা খেয়েছে’—এমন বক্তব্যের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
একদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়; অন্যদিকে জনবসতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাবার বাগানসংলগ্ন এলাকায় টিলা কেটে পাকা স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ—এ পরিস্থিতি পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অভিযুক্তের দাবি, সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাঁকে টিলা কাটার অনুমতি দিয়েছেন। অথচ সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এমন অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। ফলে অনুমতির দাবির সত্যতা, টিলা কাটার সঙ্গে কারা জড়িত এবং পূর্ববর্তী অভিযানের পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়নি—এসব বিষয় তদন্তের দাবি রাখে।
স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে ঘটনাস্থলে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে টিলা কাটা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ব্যবহৃত এক্সকাভেটর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি জব্দ, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর এ গুরুতর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয় এবং পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে কি না।