নিজস্ব প্রতিনিধি: ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ নতুন নয়। তবে এবার এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) মো. জাহাঙ্গীর আলম। স্থানীয় ভুক্তভোগী, সেবাগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর অফিস ঘিরে সক্রিয় দালালচক্র আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। সরকারি নিয়মে পাসপোর্ট করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন অজুহাতে বারবার ঘুরতে হলেও দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করলে একই কাজ তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, নিয়মিত (রেগুলার) পাসপোর্ট আবেদনের ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ছদ্মবেশে গ্রাহক সেজে কথা বলার সময় কয়েকজন দালাল দাবি করেন, একটি রেগুলার পাসপোর্টের জন্য তারা প্রায় ৮ হাজার টাকা নেন। এর মধ্যে সরকারি ফি ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে প্রতি আবেদন থেকে এক হাজার টাকা ‘অফিস খরচ’ হিসেবে দিতে হয়। তাদের ভাষ্য, এই অর্থ না দিলে আবেদন বিভিন্নভাবে আটকে রাখা বা বিলম্বিত করা হয়। যদিও এ দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রামাণ্য নথি পাওয়া যায়নি।
পাসপোর্ট অফিস-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০টি আবেদন জমা পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, এর মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ আবেদন দালাল বা ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আরও অভিযোগ উঠেছে, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম ও মনোহরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার এমন কিছু ব্যক্তি, যাদের বিরুদ্ধে মাদক, সন্ত্রাস কিংবা অন্যান্য মামলার অভিযোগ রয়েছে, তারা দালালের মাধ্যমে ফেনী অফিস থেকে সহজেই পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে পারছেন। এমনকি অন্য আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে জটিলতায় পড়া কিছু আবেদনকারীও ফেনী অফিসে এসে টাকার বিনিময়ে পাসপোর্ট পাচ্ছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
এ ছাড়া ভুয়া জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে কিছু বিদেশি নাগরিক, এমনকি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট করে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দালালচক্র প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে এসব আবেদন জমা দেয়। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আবেদনপত্র, জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং পাসপোর্ট ইস্যুর নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন।
সেবাগ্রহীতাদের আরও অভিযোগ, দালালের মাধ্যমে আবেদন করলে অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য অফিসে উপস্থিতও হতে হয় না। অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে বাসায় বসেই পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে দাবি করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। তাদের অভিযোগ, অফিসসংলগ্ন সক্রিয় দালালচক্র কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) মো. জাহাঙ্গীর আলম সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তাঁর কার্যালয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা ঘুষের সুযোগ নেই এবং তিনি কিংবা তাঁর অফিসের কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। তিনি আরও বলেন, অফিসের বাইরে কোনো ব্যক্তি অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলে তার দায় পাসপোর্ট অফিস নেবে না।
এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা।