আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ক্রমবর্ধমান বাড়িভাড়া, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, কর্মসংস্থানের সংকট এবং শিক্ষাব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার প্রতিবাদে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আন্দোলনে নেমেছে তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জি। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, বেলজিয়াম, আলবেনিয়া, গ্রিস ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দাবিতে তরুণদের বিক্ষোভ সরকার ও নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ তৈরি করছে।
আন্দোলনকারীদের অনেকের অভিযোগ, তাঁদের বাবা-মায়ের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমানে বাড়ি কেনা বা ভাড়া নেওয়া, মানসম্মত শিক্ষা অর্জন এবং স্থিতিশীল কর্মসংস্থান পাওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি সরকারের কাছ থেকে আরও কার্যকর সহায়তা চান তাঁরা।
বিভিন্ন দেশে আন্দোলনের কারণ ও দাবিতে পার্থক্য থাকলেও আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের জায়গায় মিল রয়েছে। এ ছাড়া শ্রমবাজারের পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনও তরুণদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ
স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাস্কালকে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন তরুণ-তরুণীরা। তাঁদের প্রতিবাদের কেন্দ্রে রয়েছে আবাসনসংকট ও সাধারণ মানুষের বাসস্থানের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
ইতালির রাজধানী রোমে শিক্ষার্থীরা বলছেন, আবাসনের উচ্চ ব্যয়ের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। রোমের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এলিসা পাস্তোরে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে জানান, তিনি ও তাঁর ভাই যে কক্ষে থাকেন, সেটির ভাড়া জোগাড় করতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হয়।
একই ধরনের দাবিতে পর্তুগালেও বিক্ষোভ হয়েছে। দেশটির রাজধানী লিসবনে হাজার হাজার মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসনের দাবিতে জড়ো হন।
তরুণদের এসব আন্দোলনে আবাসনকে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে নয়, বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় সামাজিক সংকট হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও সরকারি বিনিয়োগের দাবি
ফ্রান্সে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়নের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। এ আন্দোলনে শিক্ষকদেরও অংশ নিতে দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এসব দাবি জানানো হলেও প্রত্যাশিত সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না।
ফ্রান্সের প্রধান ছাত্র সংগঠন ‘ইউএনইএফ’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস ডি ব্রিটো সিএনএনকে বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের তরুণদের দাবির মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসন সমস্যার সমাধান চান তাঁরা।
ব্রিটো বলেন, ‘মানুষ উত্তরের অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।’
ইতালি ও গ্রিসেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা উন্নত বিদ্যালয়, বিনামূল্যে সরকারি শিক্ষা এবং জনসেবামূলক খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের অনেকে ‘গ্রিস থেকে ফ্রান্স—আমরা চাই সবার জন্য উন্মুক্ত ও বিনামূল্যে শিক্ষা’ স্লোগান দিয়েছেন।
রাজনীতি ও সরকারের ওপর আস্থার সংকট
বেলজিয়ামভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ইউরোপিয়ান করেসপন্ডেন্ট’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক জুলিয়াস ফিনটেলম্যানের মতে, এসব প্রতিবাদ তরুণদের মধ্যে সরকারের প্রতি হতাশার প্রতিফলন। তাঁর ভাষ্য, ইউরোপের রাজনীতি পরবর্তী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে—এমন একটি ধারণা তরুণদের মধ্যে তৈরি হয়েছে।
আলবেনিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে দেশটিতে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিলে প্রধানমন্ত্রী এদি রামা পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। একই সঙ্গে অস্থিরতার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দায়ী করেন তিনি।
একজন বিক্ষোভকারী রয়টার্সকে বলেন, তাঁরা পরিবর্তন চান বলেই রাস্তায় নেমেছেন। তাঁর ভাষ্য, তাঁরা বিপ্লব ও নতুন সরকার চান এবং দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন।
সামনে আরও বিক্ষোভের কর্মসূচি
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণদের আন্দোলন অব্যাহত থাকার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। জার্মানিতে ‘জেন জেড রেগেল্ট’—অর্থাৎ ‘জেন-জি সব সামলে নেবে’—নামে একটি গোষ্ঠী ৩১ অক্টোবর দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
স্পেনের ট্রেড ইউনিয়নগুলো ১১ নভেম্বর সাধারণ ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, ব্রিটেন ও ইতালির ছাত্র সংগঠনগুলো শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে ২০ নভেম্বর কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এসব আন্দোলনের বিস্তার দেখাচ্ছে, তরুণদের উদ্বেগ শুধু একটি দেশ বা নির্দিষ্ট কোনো দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতায় মিল রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধানে সরকারগুলো কী পদক্ষেপ নেয়, তা ভবিষ্যতে আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।