স্টাফ রিপোর্টার:
বরিশাল নগরীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও আকস্মিক রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে গোয়েন্দা নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর পারস্পরিক সমন্বয় নিয়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাচ্ছে—এমন অভিযোগ করেছেন মাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা। তাদের প্রশ্ন, কর্মসূচি সংঘটিত হওয়ার আগেই যদি সংশ্লিষ্টদের গতিবিধি শনাক্ত করা না যায়, তাহলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে?
তবে গোয়েন্দা তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি)। সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন উৎস থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে নগরীতে চেকপোস্ট, টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তাদের দাবি, ঝটিকা মিছিলের ধরনই এমন যে অল্পসংখ্যক ব্যক্তি খুব অল্প সময়ে জড়ো হয়ে কর্মসূচি শেষ করে চলে যাওয়ায় প্রতিটি ঘটনার তথ্য আগেভাগে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই দুই বক্তব্যের মাঝেই সামনে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—বরিশালে নিষিদ্ধ দলের আকস্মিক তৎপরতা ঠেকাতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও মাঠপর্যায়ে তা পৌঁছানোর ব্যবস্থাটি আসলে কতটা কার্যকর?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে বরিশালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতা দৃশ্যমান হতে শুরু করে। শুরুতে ভোরের দিকে ছোট পরিসরে ঝটিকা মিছিল হলেও পরে বিভিন্ন দিবস ও রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিছিল-বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বরিশাল নগরীর প্রধান সড়কে মিছিলের ঘটনাও ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
প্রথমদিকে এসব কর্মসূচি মূলত মিছিল ও স্লোগানকেন্দ্রিক থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিস্ফোরণের ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। গত ৬ আগস্ট আবু রায়হান মোহাম্মদ সালেহ বিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ১২ আগস্ট বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালত চত্বরে ককটেলসদৃশ একটি বস্তুর বিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনাটি আদালতের প্রধান ফটকের কাছাকাছি এলাকায় ঘটে এবং এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। পুলিশ ঘটনাস্থল ঘিরে আলামত সংগ্রহ ও তদন্ত শুরু করে।
এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর নগরীর কাশিপুর এলাকায় বিভাগীয় কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়সংলগ্ন ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ঝটিকা মিছিলের পর ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মিছিলটি ওই এলাকায় এসে স্লোগান দেয় এবং এরপর বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে অংশগ্রহণকারীরা দ্রুত সরে যান। পুলিশ ঘটনাস্থলের আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যালয়ের কাছাকাছি এলাকায় এমন ঘটনা ঘটায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এ ধরনের একটি মিছিল কীভাবে ওই এলাকায় পৌঁছাল এবং বিস্ফোরণের আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি কোনো সতর্কতামূলক তথ্য পেয়েছিল?
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বিএমপির কয়েকজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত তথ্য পাওয়া গেলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের ঝটিকা কর্মসূচি সম্পর্কে অনেক সময় নির্ভরযোগ্য আগাম তথ্য পাওয়া যায় না। তাদের ভাষ্য, কর্মসূচি সম্পর্কে আগে থেকে তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, প্রবেশপথে নজরদারি বৃদ্ধি, চেকপোস্ট বসানো কিংবা সম্ভাব্য জমায়েতের আগেই তা প্রতিহত করার সুযোগ থাকত। এক কর্মকর্তা বলেন, কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, আলামত সংগ্রহ, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে হয়। এতে মাঠপর্যায়ের পুলিশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
তার মতে, ঘটনার পর অভিযান চালানোর পাশাপাশি আগাম তথ্য সংগ্রহ ও দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আরও বাড়ত। গোয়েন্দা তথ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বিএমপির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের আকস্মিক তৎপরতার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সব সময় যথাসময়ে পৌঁছায় কি না, সেটি পর্যালোচনার বিষয়।
অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু তথ্য আছে কি নেই—সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়। কোনো তথ্য পাওয়া গেলে সেটি কত দ্রুত যাচাই করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট ইউনিটে পাঠানো হচ্ছে কি না এবং মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সময় পাওয়া যাচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। তবে গোয়েন্দা তথ্য একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ মানতে নারাজ বিএমপি কমিশনার আবু রায়হান মোহাম্মদ সালেহ। তার বক্তব্য, গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায় বলেই নগরীতে নিয়মিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। চেকপোস্ট বৃদ্ধি, টহল জোরদার এবং নজরদারি বাড়ানোর কারণে নগরীর ভেতরে বড় ধরনের তৎপরতার সুযোগ কমেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে বাইরের উপজেলা ও ইউনিয়ন থেকে লোক এনে স্বল্প সময়ের জন্য ঝটিকা কর্মসূচি চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অংশগ্রহণকারী কম হওয়ায় এবং কর্মসূচি দ্রুত শেষ হওয়ায় দু-একটি ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব নাও হতে পারে। তিনি আরও বলেন, সব ঘটনা যে গোয়েন্দা নজরদারির বাইরে থাকে, তা নয়; বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তথ্যের ভিত্তিতে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিএমপি কমিশনারের দাবি, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে এখন পর্যন্ত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন তৎপরতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৭০ থেকে ৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে গ্রেপ্তারের এই সংখ্যা ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পৃথক মামলার নথি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিচয় এবং অভিযোগের ধরন বিশ্লেষণ করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পরিধি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।
বরিশালের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে—আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং প্রতিরোধমূলক গোয়েন্দা ব্যবস্থা কতটা সক্রিয়? একটি ঝটিকা মিছিল কয়েক মিনিটের মধ্যে সংগঠিত হয়ে শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই মিছিলের প্রস্তুতি, অংশগ্রহণকারীদের যোগাযোগ, সম্ভাব্য জমায়েতের স্থান এবং চলাচলের পথ সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব কি না—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একই সঙ্গে কোনো সংস্থার কাছে তথ্য থাকলে তা অন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে কত দ্রুত পৌঁছায়, তথ্য যাচাইয়ের পর মাঠপর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় কি না এবং ঘটনার পর দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোন স্তরের দায়িত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়—এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে তাই শুধু ‘গোয়েন্দা ব্যর্থতা’ বা ‘পুলিশের সাফল্য’—এই দুই মেরুতে বিষয়টিকে দেখার সুযোগ নেই। প্রকৃত চিত্র জানতে প্রয়োজন ঘটনার আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কী তথ্য ছিল, কখন ছিল, কোন ইউনিটে ছিল এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয় যাচাই করা।
২৩ সেপ্টেম্বরের বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে। সেই ফুটেজ, ঘটনাস্থলের আলামত, মিছিলকারীদের গতিপথ এবং পরবর্তী গ্রেপ্তার ও মামলার নথি বিশ্লেষণ করলে আগাম নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যেতে পারে।