মোঃ আনজার শাহ:
রাজনীতির মঞ্চে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, জায়গা করে নেয় মানুষের হৃদয়ে। শনিবার কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর স্কুল মাঠে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠিক তেমনই এক আবেগঘন পরিবেশের জন্ম দিলেন। স্মৃতিচারণ, রসিকতা, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি আর জনগণের প্রতি ভালোবাসায় ভরা তাঁর বক্তব্যে মুহূর্তেই উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো জনসভাস্থল।
“বরুড়া আর বগুড়ার উচ্চারণ কাছাকাছি। আমি ২০০১ সালের নির্বাচনের সময় বরুড়ার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম।আমার জেলা বগুড়া আর বরুড়ার উচ্চারণ যেমন কাছাকাছি, তেমনি বরুড়াও আমার হৃদয়ের খুব কাছের। আমি যেমন নিজের এলাকার উন্নয়ন দেখি, ঠিক তেমনি বরুড়ার উন্নয়নেও পাশে থাকব।”
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য শেষ হতেই করতালি, স্লোগান আর উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে লক্ষ্মীপুর মাঠ। হাজারো মানুষের আবেগঘন উপস্থিতিতে পথসভাটি রূপ নেয় এক ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে।
শনিবার (১৬ মে ২০২৬) দুপুরে চাঁদপুরে ঘোষিত সরকারের ‘খাল খনন কর্মসূচি’র উদ্বোধনে যাওয়ার পথে বরুড়ায় এই বিশাল পথসভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সকাল থেকেই লক্ষ্মীপুর স্কুল মাঠে ঢল নামে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-যুবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের। পুরো এলাকা পরিণত হয় উৎসবমুখর রাজনৈতিক মহাসমাবেশে।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যতটুকু আমার মনে পড়ে, ২০০১ সালের নির্বাচনের সময় আমি বরুড়ায় এসেছিলাম। সেদিন পুরো বরুড়ায় সম্ভবত ৮ থেকে ১০টি পথসভা করেছিলাম। শেষ জনসভাটি সম্ভবত এখানেই হয়েছিল। রাত প্রায় ১১টার দিকে সভা শেষ করে আমি ঢাকায় ফিরেছিলাম।”
বরুড়ার মানুষের ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “বরুড়ার মানুষের ভালোবাসা আমি কখনও ভুলিনি। আজ এত বছর পর আবার সেই ভালোবাসা আমাকে নতুন করে আবেগাপ্লুত করেছে।”
তারেক রহমান বলেন, “আমরা শুধু প্রতিশ্রুতি দিই না, জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশ্বাস করি। ক্ষমতায় আসার পর একে একে সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। কুমিল্লা বিভাগ যদি জনগণের প্রাণের দাবি হয়ে থাকে, ইনশাল্লাহ সেটিও বাস্তবায়ন হবে।”
তিনি বলেন, বিএনপি জনগণের দল এবং জনগণের কল্যাণই এ দলের মূল রাজনীতি। কৃষকদের উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সরকার গঠনের মাত্র দশ দিনের মধ্যে ১২ লাখ কৃষকের কৃষিঋণ মওকুফ করেছি। এতে লাখো কৃষক নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন।”
বাংলাদেশকে কৃষিনির্ভর দেশ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কুমিল্লা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি অঞ্চল। এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। আমি খুব দ্রুত শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করব। যত দ্রুত সম্ভব কুমিল্লায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
বিগত সরকারের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “গত ১৭ বছর দেশের মানুষের ওপর নির্যাতন, গুম, খুন ও দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে। দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে অর্থনীতি বড় চাপের মধ্যে রয়েছে। তবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা দেশকে আবারও ঘুরে দাঁড় করাব।”
তিনি আরও বলেন, “জনগণই বিএনপির আসল শক্তি। আসুন, সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার কাজে অংশ নিই। সবার আগে বাংলাদেশ এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।”
পথসভায় সভাপতিত্ব করেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। বক্তব্য দেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী হাজী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন, কুমিল্লা বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়া, মনিরুল হক চৌধুরী, মো. আবুল কালাম, মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া, কুমিল্লা সিটির প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু, মহানগর বিএনপির সভাপতি উদবাতুল বারী আবু, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম এবং বরুড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি কায়সার আলম সেলিম।
সমাবেশে স্থানীয় নেতারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘খাল খনন কর্মসূচি’ দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। খাল পুনঃখননের মাধ্যমে সেচব্যবস্থা উন্নত হবে, বাড়বে কৃষি উৎপাদন, শক্তিশালী হবে গ্রামীণ অর্থনীতি।
শনিবারের বরুড়া যেন শুধুই একটি রাজনৈতিক পথসভা দেখেনি; বরং প্রত্যক্ষ করেছে মানুষের ভালোবাসা, স্মৃতি, উন্নয়ন আর রাজনৈতিক বিশ্বাসের এক অনন্য মিলনমেলা। লক্ষ্মীপুর মাঠের সেই গর্জন যেন নতুন করে জানিয়ে দিল মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারাই একজন নেতার সবচেয়ে বড় অর্জন।