মো. শামীম হোসেন সিকদার:
বান্দরবান হর্টিকালচার সেন্টারে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চারা বিতরণ ও প্রদর্শনী স্থাপনের নামে বাস্তবায়িত প্রায় ৩ কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তবে ওই প্রকল্পে ওঠা অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কিংবা সুনির্দিষ্ট হিসাব-নিকাশ নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই অভিযুক্ত উপপরিচালক লিটন দেবনাথকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আবারও নতুন করে প্রায় দেড় কোটি টাকার প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় কৃষক, সচেতন মহল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত অর্থবছরে চারা বিতরণ ও প্রদর্শনী স্থাপনের জন্য বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা চারার মান, প্রকৃত উৎস এবং বিল-ভাউচারে দেখানো তথ্য নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও মাঠপর্যায়ে তার কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি। অনেক কৃষককে দুর্বল ও নিম্নমানের চারা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
থানচির এক ভুক্তভোগী কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক স্বাধীন সংবাদকে বলেন, উন্নয়নের কথা বলে তাদের যেসব চারা দেওয়া হয়েছে, তার অধিকাংশই মরা ও দুর্বল ছিল। বিশেষ করে বাঁশের চারাগুলো অত্যন্ত চিকন ছিল এবং মাটিতে রোপণের পরপরই অনেক চারা শুকিয়ে যায়। তার ভাষায়, সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও কৃষকদের বাস্তবে কোনো উপকার হয়নি।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, বান্দরবান হর্টিকালচার সেন্টারে প্রয়োজনীয় পরিমাণ চারা উৎপাদন বা মজুত না থাকায় গতবারের মতো এবারও বাইরে থেকে নিম্নমানের চারা সংগ্রহ করে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। অথচ এসব চারা বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারে উৎপাদিত উন্নতমানের চারা হিসেবে বিল-ভাউচারে দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় ও অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
সূত্র জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি’র আওতায় প্রথম ধাপে ১ লাখ ফলদ ও বনজ চারা বিতরণ, রোপণ ও প্রদর্শনী স্থাপনের জন্য বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আগের প্রকল্প নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পুনরায় এই প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
বান্দরবান দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অংচমং একই কর্মকর্তাকে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি দৈনিক স্বাধীন সংবাদকে বলেন, হর্টিকালচার সেন্টারে এমনিতেই লোকবলের অভাব রয়েছে। শুধু প্রদর্শনী প্লট তৈরি করলেই হবে না, সেগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণও প্রয়োজন। কিন্তু সেই কাজ করার মতো পর্যাপ্ত লোকবল কোথায়—এ প্রশ্নও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আগের বছর প্রায় ৩ কোটি টাকার চারা বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরও কীভাবে একই কর্মকর্তাকে আবার দেড় কোটি টাকার প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলো, সেটি বোধগম্য নয়। তার অভিযোগ, জেলা পরিষদের অসাধু কর্মকর্তাদের মদদ ছাড়া এ ধরনের অনিয়ম সম্ভব নয়। যদি জেলা পরিষদের কোনো কর্মকর্তা এ ঘটনায় জড়িত না থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এদিকে প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম দৈনিক স্বাধীন সংবাদকে বলেন, ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ফলদ ও বনজ প্রকল্পের আওতায় চারা বিতরণের পর কোনো চারা খারাপ হলে তা পরিবর্তন করে দিতে হবে। কারও বিরুদ্ধে স্পষ্ট অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে জেলা পরিষদ সরাসরি ব্যবস্থা নেবে।’
তিনি আরও বলেন, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ এর আগেও দুর্নীতির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করেছে। কোনো প্রকল্পে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলের দাবি, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস নয়, আগের প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ হিসাব-নিকাশ ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন করে দেওয়া দেড় কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা এবং নিম্নমানের চারা বিতরণের অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের মতে, সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত কৃষি ও বৃক্ষরোপণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কৃষক ও পরিবেশের উন্নয়ন। কিন্তু প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে অনিয়ম হলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হয়, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ কৃষকরাই। তাই আগের প্রকল্পের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নতুন প্রকল্পেও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।