বিশ্ব বসতি মেলার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সভাপতিত্বে গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন

মোঃ আনজার শাহ

বিশ্ব বসতি দিবস-২০২৬ উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী আবাসন মেলার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে একটি স্বর্ণচাঁপা গাছের চারা রোপণ করেন। মেলায় মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থার পাশাপাশি আবাসন, নির্মাণ ও ব্যাংকিং খাতের প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে।
‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বাসস্থান প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। পরিকল্পিত আবাসন, টেকসই নগরায়ণ এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করাই হবে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্যতম ভিত্তি।

জনসংখ্যার চাপ ও পরিকল্পিত নগরায়ণ:
মন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ শহরমুখী হওয়ায় সীমিত জমির ওপর আবাসনের চাপও বাড়ছে। এই বাস্তবতায় নগর ও অঞ্চলগুলোকে পরিকল্পিত, উৎপাদনশীল ও পরিবেশবান্ধব জনপদে রূপান্তর করা সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মন্ত্রণালয় সেই লক্ষ্যেই নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
মাস্টারপ্ল্যানে সুরক্ষিত হবে কৃষিজমি ও জলাভূমি:
কৃষি, শিল্প, আবাসন ও সবুজ এলাকার জন্য আলাদা জোন চিহ্নিত করে সিটি করপোরেশন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, এর ফলে পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল, জলাভূমি ও উর্বর কৃষিজমি অপরিকল্পিত উন্নয়নের গ্রাস থেকে রক্ষা পাবে।
ঢাকার চাপ কমাতে আঞ্চলিক কেন্দ্র:
রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত চাপ কমাতে দেশের অন্যান্য শহরকে কার্যকর আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা জানান জাকারিয়া তাহের সুমন। তিনি বলেন, এসব শহরে পরিকল্পিত অবকাঠামোর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। এতে বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকেন্দ্র সৃষ্টি হবে এবং রাজধানীকেন্দ্রিক চাপ কমবে।
স্বল্প ও নিম্নআয়ের মানুষের আবাসন:
স্বল্প ও নিম্নআয়ের মানুষের আবাসন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সীমিত আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পরিকল্পিত আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্যও আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
সবুজ নগরায়ণে জোর:
সবুজ নগরায়ণ নিশ্চিত করতে পার্ক, লেক ও উন্মুক্ত স্থান উন্নয়নের পাশাপাশি শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্য নিরাপদ পরিবেশে খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, নগর উন্নয়নকে কেবল ইট-পাথরের অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না; মানুষের জীবনমান, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে তা সমন্বিত করা হচ্ছে।
ভূমিকম্প-ঝুঁকি মোকাবিলা ও নিরাপদ ভবন:
ভূমিকম্পসহ অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ঝুঁকি কমাতে ‘আর্থকোয়েক সেফটি অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ গঠন করা হয়েছে। নিরাপদ ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি’। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমি ব্যবহার ও ছাড়পত্র প্রদানের কার্যক্রম অনলাইনে আনা হয়েছে।
বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা, নতুন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ:
নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী জানান, আধুনিক কেন্দ্রীয় স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং সুবিধা গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধ, দুর্যোগ মোকাবিলা ও উন্নত নাগরিকসেবা নিশ্চিত করতে সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জে নতুন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের কার্যক্রমও চলমান।
ঢাকাকে আরও বাসযোগ্য করে তুলতে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন বলে জানান তিনি। পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ‘পুরাতন ঢাকা রিভাইটালাইজেশন’ ও ‘ঢাকা আরবান রিজেনারেশন’-সহ বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
অতীতের অনিয়মের সমালোচনা:
আবাসন খাতের অতীত অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে গৃহায়নমন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে পরিকল্পিত নগরায়ণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় এগোয়নি। ভবন নির্মাণে বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়নেও ঘাটতি ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে বড় বড় মেগা প্রকল্পের আড়ালে বিপুল অর্থ পাচার ও অপচয় হয়েছে। বর্তমান সরকার এসব অনিয়মের অবসান ঘটিয়ে আবাসন খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
বেসরকারি খাতের প্রতি আহ্বান:
বেসরকারি আবাসন খাতসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, পরিবেশ সুরক্ষা, নিরাপদ নির্মাণ ও মানসম্মত অবকাঠামোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর ভাষ্য, একটি বাসযোগ্য শহর কেবল দালান-কোঠায় গড়ে ওঠে না; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পরিবেশ, নাগরিক নিরাপত্তা, চলাচলের সুবিধা, উন্মুক্ত স্থান এবং মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার।
আশাবাদ
আশাবাদ ব্যক্ত করে জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় সরকারের সব মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিটি মানুষের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই লক্ষ্য অর্জিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর এবং জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেচনিয়াক। মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, আমন্ত্রিত অতিথি ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *