স্টাফ রিপোর্টার:
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘আন্ডা রফিক’ নামে পরিচিত, তাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। জমি দখল, ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি, অর্থপাচার, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি আলোচিত। বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত এবং স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বহুমাত্রিক অনিয়ম ও অপরাধের নানা তথ্য উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের দাবি, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের প্রভাববলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই দীর্ঘ সময় ধরে রফিকুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা প্রশাসনিক সুবিধা ভোগ করেছেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রূপগঞ্জের নাওড়া, কায়েতপাড়া ও আশপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষের জমি দখল, বসতভিটা থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা এবং বাধা দিলে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে রফিক ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে বলেও জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়ে মসজিদ, মাদরাসা, কবরস্থান, সরকারি রাস্তা এবং খাসজমি দখলের ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এলাকায় একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তোলা হয়।
অন্যদিকে, ব্যাংক খাতে শত শত কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে আন্ডা রফিকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, একই জমি বিভিন্ন ব্যাংকে বন্ধক রেখে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে সেই বন্ধকী সম্পদের একটি অংশ অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলেও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, রফিকুল ইসলাম ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে আদালতের নির্দেশে তার বিভিন্ন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমদের অবৈধ সম্পদ ও অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগের তদন্তেও রফিকুল ইসলাম ও তার ঘনিষ্ঠদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো বিচারিক চূড়ান্ত রায় হয়নি।
এ ছাড়া বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং কেন্দ্র দখলের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অস্ত্রধারী সহযোগীদের নিয়ে ভোটারদের নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি ২০১৮ সালে এক বাংলাদেশি মডেল ও অভিনেত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে হেনস্তা ও শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগও আনেন, যা সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে রফিকুল ইসলাম আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলছেন। এদিকে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ছোট ভাই মিজানুর রহমানকে ইতোমধ্যে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে। এছাড়া তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে রফিকুল ইসলাম কিংবা তার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।