স্টাফ রিপোর্টার:
নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যানার ঝুলছে সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে। তফসিল ঘোষণা হয়েছিল। মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। প্রার্থিতা প্রত্যাহার, যোগ্যতা যাচাই ও প্রতীক বরাদ্দের প্রক্রিয়াও এগিয়েছিল। নির্ধারিত হয়েছিল ভোটের দিনও। কিন্তু আগের দিন রাতের হঠাৎ নোটিশে স্থগিত করা হয় ভোটগ্রহণ কার্যক্রম। বন্যার কারণে নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর নির্বাচনের পরবর্তী তারিখ ঘোষণার কথা থাকলেও নতুন তফসিল ছাড়াই নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে গঠন করা হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার নতুন কমিটি। তোপের মুখ থেকে বাঁচতে প্রত্যাহার করা প্রার্থীর নাম তালিকায় দিলেও ক্রীড়াঙ্গনে চলছে ক্ষোভ ও চরম সমালোচনা। যেন এক নাটকীয়তায় ভরা ক্রীড়া সংস্থার কমিটি। ১৮ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের স্বাক্ষরিত এক আদেশে ৪১ সদস্যের নতুন কমিটি গঠন করা হয়।
এ ঘটনায় স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন, ক্ষোভ ও অসন্তোষ। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করে শেষ পর্যন্ত ভোট ছাড়াই কমিটি গঠন করা হলো কেন—এ প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, নির্বাচন আয়োজনের জন্য তফসিল ঘোষণা, মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিল, প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের মতো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নির্বাচন না করেই নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাঁদের আরও অভিযোগ, নতুন কমিটিতে দীর্ঘদিনের ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রত্যাশিত গুরুত্ব না দিয়ে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি কয়েকজন জামায়াত-সমর্থিত ব্যক্তিকেও কমিটিতে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু এখানেই নয়, কমিটির বিষয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিএনপি, ছাত্রদল ও জামায়াতের একাংশ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তফসিল থেকে ভোট, তারপর হঠাৎ কমিটি: সাতকানিয়া উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে গত ২ জুলাই তফসিল ঘোষণা করা হয়। চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার গঠনতন্ত্রের ১১.৬ অনুচ্ছেদের আলোকে এ নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থীদের জন্য নির্ধারণ করা হয় ৫ হাজার টাকা জামানত। তফসিল অনুযায়ী সাধারণ সম্পাদক পদে ৯ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিল করেন। তাঁদের মধ্যে ৩ জন পরে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। ২৩ জুলাই ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারিত থাকলেও দক্ষিণ চট্টগ্রামজুড়ে ভয়াবহ বন্যার কারণে নির্বাচন স্থগিত করা হয়। তাও ঘোষণা হয় নির্বাচনের আগের দিন রাতে। বন্যার কারণে নির্বাচন স্থগিত হওয়াকে তখন সংশ্লিষ্টদের কেউ বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখেননি। কিন্তু নির্বাচন স্থগিতের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহই এখন তৈরি করেছে নতুন প্রশ্ন।
ফের প্রত্যয়নপত্র, তবুও কেন ভোট নয়?
নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর ১১ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা প্রার্থীদের কাছে নতুন করে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন পরিচালনার জন্য উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সদস্য হিসেবে প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে। এর আগে যেসব প্রার্থী খেলোয়াড় হিসেবে প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন, তাঁদের সাধারণ সদস্য হিসেবে নতুন প্রত্যয়নপত্র দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ জন্য ১৬ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হলে প্রার্থিতা বাতিল হবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
এ অবস্থায় প্রার্থীরা ধরে নিয়েছিলেন, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে নতুন করে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হবে। কিন্তু নতুন তফসিল আর ঘোষণা হয়নি। এর মাত্র দুই দিনের মাথায়, ১৮ আগস্ট প্রকাশ্যে আসে নতুন কমিটি গঠনের খবর।
বিনা ভোটে নতুন কমিটি: নির্বাচন ছাড়াই কমিটি গঠনের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা প্রার্থীদের কেউ কেউ। সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী দিদারুল আলম বলেন, বন্যার কারণে নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর আমরা পরবর্তী তফসিলের অপেক্ষায় ছিলাম। পরে ১১ আগস্ট নতুন করে প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে বলা হয়। সেটিও আমরা দিয়েছি। কিন্তু এর মধ্যেই ১৮ আগস্ট কোনো নির্বাচন ছাড়াই নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে আমরা স্বাভাবিকভাবেই বিস্মিত ও হতাশ। তিনি বলেন, “নির্বাচন স্থগিত হলে পুনরায় তফসিল ঘোষণা করে ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্ধারণ করাই স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া। কিন্তু নির্বাচনী কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় হঠাৎ করে নির্বাচন ছাড়াই কমিটি গঠন করা হলো কেন, সেটি প্রশাসনের কাছে আমাদের প্রশ্ন।” দিদারুল আলম আরও বলেন, কোন গঠনতন্ত্র বা নীতিমালার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ক্রীড়া সংস্থার নেতৃত্ব রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘদিনের অবদান, সাংগঠনিক দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ মহসীন ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেন, “আমার নামটি ব্যবহার করে কমিটি জায়েজ করার চেষ্টা! এটা ‘আওয়ামী অহংকার’ কমিটি। পদত্যাগ না করার জন্য গতকাল আমার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছি..! উপজেলা প্রশাসন, সাতকানিয়া।”
কমিটিতে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রাধান্যের অভিযোগ: নতুন কমিটি গঠনের পর এর সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনে। ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট একটি অংশের অভিযোগ, নতুন কমিটিতে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন জামায়াত-সমর্থিত ব্যক্তিকেও সদস্য করা হয়েছে বলে তাঁরা দাবি করছেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত অনেক সংগঠক ও ক্রীড়াপ্রেমীকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ তাঁদের। তবে নতুন কমিটির সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে কি না—এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ক্রীড়া সংস্থার নেতৃত্ব নির্ধারণে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সাংগঠনিক দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও ক্রীড়াঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৪১ সদস্যের নতুন কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে গিয়াসউদ্দিন হিরুকে। তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ এই পদে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও স্থানীয় ক্রীড়া অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাতকানিয়ায় ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলাধুলার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছেন বহু সংগঠক। কেউ খেলোয়াড় তৈরিতে কাজ করছেন, কেউ স্থানীয় টুর্নামেন্ট আয়োজন করছেন, আবার কেউ মাঠ ব্যবস্থাপনা ও ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনায় ভূমিকা রেখে আসছেন। নতুন কমিটি গঠনের পর এসব সংগঠকের একটি অংশের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থাকা ক্রীড়া সংগঠকদের সঙ্গে প্রশাসনিক নেতৃত্বের সমন্বয় থাকলে স্থানীয় খেলাধুলার উন্নয়ন আরও কার্যকর হতে পারে। তাই ক্রীড়া সংস্থার নেতৃত্ব নির্ধারণে মাঠের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকা ব্যক্তিদের গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
নাটকীয় কমিটি: সাতকানিয়া উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার নতুন কমিটি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন কমিটির সদস্য কারা—তার চেয়েও বেশি কী প্রক্রিয়ায় এই কমিটি গঠন করা হলো তা নিয়ে। ২ জুলাই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা, ৯ জনের মনোনয়ন দাখিল, ৩ জনের প্রার্থিতা প্রত্যাহার, ২৩ জুলাই ভোটের তারিখ নির্ধারণ, বন্যার কারণে নির্বাচন স্থগিত, ১১ আগস্ট নতুন করে প্রত্যয়নপত্র জমার নির্দেশ—সবশেষে ১৮ আগস্ট ভোট ছাড়াই ৪১ সদস্যের নতুন কমিটি। এই ধারাবাহিকতায় নতুন তফসিল কোথায়, পূর্বঘোষিত নির্বাচন কেন হলো না এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া চলমান থাকার পরও কোন বিধান বা সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কমিটি গঠন করা হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
এই বিষয়ে জানতে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। তবে এ বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীর বরাতে পাওয়া ইউএনওর বক্তব্যে ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন ও কমিটি গঠন সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না বলে জানান তিনি। ফলে তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে মনোনয়ন গ্রহণ ও নির্বাচনের প্রস্তুতি—সবকিছু সম্পন্ন হওয়ার পর বন্যার কারণে নির্বাচন স্থগিত, এরপর প্রার্থীদের নতুন করে প্রত্যয়নপত্র দাখিলের নির্দেশ এবং সবশেষে নির্বাচন ছাড়াই নতুন কমিটি—এই পুরো প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।