মোঃ ইসলাম উদ্দিন তালুকদার:
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের রাজধানীর ন্যাম ভবনের বাসা থেকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের (১৯) হাতে লেখা কয়েকটি চিঠি ও ডায়েরির পাতা উদ্ধার করেছে পুলিশ। এসব লেখায় ভালোবাসা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণার অভিযোগ, আত্মসম্মান ও গভীর মানসিক কষ্টের কথা উঠে এসেছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সংসদ সদস্যদের আবাসিক ভবন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি কক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মরদেহটি দেখতে পাওয়া যায়। পরে সিআইডির ফরেনসিক দলসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মরিয়মের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, তা তদন্ত ও ময়নাতদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। ফলে এটিকে আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু—এ মুহূর্তে চূড়ান্তভাবে বলা যাচ্ছে না।
মরিয়মের হাতে লেখা একটি চিঠিতে নিজের অসহায়ত্ব ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই…., তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…।’
আরেকটি লেখায় বিশ্বাস করে সম্পর্কে জড়ানোর পর নিজেকে পরাজিত মনে হওয়ার কথা উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, কিন্তু জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবোই বা কেমনে যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে দেখি তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলের সেনাপতি।’
আরেকটি সাধারণ পাতায় নিজের সম্পর্কের অবস্থান এবং ভালোবাসা ভাগাভাগি করার বিষয়ে মরিয়মের অনুভূতির কথা পাওয়া যায়। সেখানে লেখা, ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী-কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউয়ের। আর আমি ছিলাম বোকা…! অন্য কারও স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!
ওই লেখায় আরও বলা হয়েছে, ‘কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের কারণ… ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়… ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!’
বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতারিত হওয়ার অনুভূতিও উঠে এসেছে মরিয়মের আরেকটি লেখায়। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘সে বলেছিল- আজ থেকে আমরা বন্ধু–চলো একটা গেমস খেলি। আমিও সরল মনে বিশ্বাস করে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু কে জানতো— আমিই ছিলাম তোমার গেমসের দাবার এক গুটি।’
চিঠিগুলোতে বারবার বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং সম্পর্কের মধ্যে নিজের অবস্থান নিয়ে হতাশার কথা উঠে এসেছে। তবে এগুলো মরিয়মের ব্যক্তিগত লেখা; সেখানে করা অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
জাতীয় সংসদের প্যাডে লেখা আরেকটি পাতায় নিজের পরাজয় ও বিশ্বাসভঙ্গের কথা তুলে ধরেছেন মরিয়ম। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘আমি হেরেছি— তুমি জিতেছো– কারণ, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো।’
একই লেখায় নিজের কষ্টের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে কঠোর ভাষাও ব্যবহার করা হয়েছে। তবে চিঠিতে লেখা এসব বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও অর্থ কী ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
মরিয়মের মরদেহ উদ্ধারের পর গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাবে না বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে গত জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। পরে গাজী নজরুল ইসলাম ওই তরুণীকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এরপর ২২ জুলাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলটির পক্ষ থেকে সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা জানানো হয়।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় উদ্ধার হওয়া চিঠিগুলো এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে চিঠিতে লেখা অভিযোগ বা বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।