মোঃআনজার শাহ
ছেলেরা থাকেন পাকা বিল্ডিংয়ে, আর বৃদ্ধ বাবা দিন কাটাচ্ছিলেন মুরগির খামারে প্রতিবন্ধী মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার শাকপুর ইউনিয়নের রাজপুর গ্রামের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হতেই নড়েচড়ে বসেন প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আসাদুজ্জামান রনি স্বশরীরে ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে বৃদ্ধ পিতাকে ছেলের ঘরে তুলে দেন এবং সন্তানদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দেন।
যে চিত্র লজ্জা দেয় সমাজকে,
বরুড়া উপজেলার শাকপুর ইউনিয়নের রাজপুর গ্রামে ছয় সন্তানের জনক এক বৃদ্ধ পিতা। সারাজীবন কষ্ট করে সংসার গড়েছেন, ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছেন। অথচ জীবনের শেষ বেলায় তাঁর ঠাঁই হয়েছিল একটি মুরগির খামারে। সঙ্গে ছিলেন তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়ে। অন্যদিকে, সক্ষম ছেলেরা নিজেদের পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলেন পাকা বিল্ডিংয়ে বাবার খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি একটুও।
এই নির্মম বাস্তবতার ছবি এলাকায় ছড়িয়ে পড়তেই সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
সাংবাদিকের কলম, প্রশাসনের পদক্ষেপ,
স্থানীয় কয়েকজন সাহসী সাংবাদিক বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরেন। খবর প্রকাশের পরপরই সক্রিয় হয়ে ওঠেন বরুড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আসাদুজ্জামান রনি। তিনি দেরি না করে স্বশরীরে ছুটে যান রাজপুর গ্রামে। সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখেন এবং বৃদ্ধ পিতাকে সঙ্গে নিয়ে ছেলের পাকা বাড়িতে তুলে দেন।
এখানেই থামেননি তিনি। ছেলেদের উদ্দেশে কড়া ভাষায় সতর্ক করে দেন যারা বাবার সেবা-যত্ন করবে না, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী সন্তানদের এই দায়িত্ব পালন বাধ্যতামূলক বলেও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
মানবিক প্রশাসনের দৃষ্টান্ত,
ইউএনও আসাদুজ্জামান রনির এই তাৎক্ষণিক ও মানবিক পদক্ষেপ এলাকায় ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন শুধু দায়িত্ব পালন নয়, মানবতার টানে মাঠে নামেন তখন সেটি হয়ে ওঠে সত্যিকারের প্রশাসনের উদাহরণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইউএনওর এই উদ্যোগ ভূয়সী প্রশংসা পাচ্ছে। অনেকেই তাঁকে ‘মানবিক ইউএনও’ হিসেবে অভিহিত করে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন।
আইন কী বলে?
বাংলাদেশে ‘পিতামাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩’ অনুযায়ী, সন্তানের পক্ষে সামর্থ্য থাকলে পিতামাতার ভরণপোষণ না করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই আইনে অনধিক এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা তিন মাস কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তবু সমাজে এমন ঘটনা বারবার ঘটছে যা আইনের পাশাপাশি নৈতিক অধঃপতনেরও প্রমাণ।
শেষ কথা,
একটি মুরগির খামার এটি কোনো বৃদ্ধ পিতার শেষ আশ্রয় হতে পারে না। ছেলেদের পাকা বাড়ির চেয়ে বড় সম্পদ হওয়া উচিত ছিল বাবার প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। সেই মানবিক বোধ যেখানে হারিয়ে যায়, সেখানে প্রশাসনকেই এগিয়ে আসতে হয়।
বরুড়ার ইউএনও আসাদুজ্জামান রনি সেই কাজটিই করেছেন সাহসের সঙ্গে, মানবতার সঙ্গে। তাঁর এই উদ্যোগ শুধু একজন বৃদ্ধের আশ্রয় নিশ্চিত করেনি, বরং সমাজকে দিয়েছে একটি জরুরি বার্তা বাবা-মা সম্পদ নয়, তাঁরা আমাদের শিকড়।