আসাদুলজ্জামান:
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী এলাকায় সম্প্রতি ‘সাংবাদিক’ পরিচয়ে এক শ্রেণির চাঁদাবাজের দৌরাত্ম্য আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি বা সাংবাদিকতার ন্যূনতম যোগ্যতা ছাড়াই কিছু ব্যক্তি অনলাইন পোর্টাল বা ফেসবুক পেজ খুলে নিজেদের সংবাদকর্মী পরিচয় দিচ্ছেন এবং সেই পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ আদায় করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব তথাকথিত সংবাদকর্মীদের অধিকাংশেরই নেই কোনো অফিস, নেই নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান, নেই পেশাদার কোনো কাঠামো। একটি স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই তাদের প্রধান ‘অস্ত্র’। এভাবেই তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করছে।
স্থানীয়রা জানান, সমাজে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যারা বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তারা ‘সাংবাদিক’ শব্দটি শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এই ভয়ের সুযোগ নিয়ে চাঁদাবাজ চক্রটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে গিয়ে ভিডিও ধারণ, তথ্য ফাঁস বা সংবাদ প্রকাশের হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সামাজিক সম্মান বা আইনি ঝামেলার ভয়ে চুপচাপ টাকা দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলেন।
এতে করে প্রকৃত সাংবাদিকদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, কিছু অসাধু ব্যক্তির কারণে গোটা সাংবাদিক সমাজের ওপর আস্থা কমে যাচ্ছে, যা গণমাধ্যমের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
সম্প্রতি যাত্রাবাড়ী এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাও এ ধরনের চাঁদাবাজির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। অভিযোগ রয়েছে, এক পুলিশ কর্মকর্তা (এএসআই) জিডিতে উল্লেখিত একটি হারানো মোবাইল ফোন উদ্ধার করার পর সেটি বিক্রির চেষ্টা করছিলেন। এমন সময় ‘সাংবাদিক’ পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ শুরু করেন এবং ওই কর্মকর্তাকে হুমকি দেন—নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ না দিলে ভিডিওটি প্রকাশ করা হবে, যার ফলে তার চাকরি হুমকির মুখে পড়তে পারে।
পরে ভয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বিষয়টি অর্থের বিনিময়ে মীমাংসা করেন বলে জানা গেছে। তবে এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—যদি কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অর্থ আদায় করা কি আরও বড় অপরাধ নয়? সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড সরাসরি চাঁদাবাজির শামিল এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সহজলভ্য হওয়ায় যে কেউ খুব সহজেই নিজেকে সাংবাদিক দাবি করতে পারছে। ফলে প্রকৃত ও ভুয়া সাংবাদিকের মধ্যে পার্থক্য করা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয়দের প্রতি কিছু পরামর্শ দিয়েছেন অভিজ্ঞ মহল। তারা বলছেন, কেউ সাংবাদিক পরিচয়ে এলে প্রথমেই তার পরিচয়পত্র, প্রতিষ্ঠানের নাম এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ নম্বর যাচাই করা উচিত। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে যে, ওই ব্যক্তি সত্যিই কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিবেদক কিনা।
এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি যদি নিজের মৌলিক তথ্য—যেমন শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মস্থল বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়—স্পষ্টভাবে দিতে না পারেন, তাহলে তার বিষয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের চাঁদাবাজি প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদেরও সাহস করে আইনের আশ্রয় নেওয়া উচিত। অভিযোগ দায়ের হলে তদন্তের মাধ্যমে এসব ভুয়া সাংবাদিকদের প্রকৃত পরিচয়, আয়ের উৎস ও অপরাধের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পাবে, যা ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ দমনে সহায়ক হবে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—সাংবাদিকতার মতো একটি সম্মানজনক পেশাকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এবং দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।