আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা কিছুটা কমে আসা, হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা এবং যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার আভাসে বিশ্ববাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ৭ শতাংশের বেশি কমে যায়। এ সময় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমে আসে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসায় তেলের বাজারে এই পতন দেখা যায়।
ইরানে টানা ১৩ দিন হামলার পর সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতিসংঘ দূত জানান, আলোচনার পথ খোলা রাখতে ট্রাম্প কিছুটা সুযোগ দিচ্ছেন।
অন্যদিকে তেহরানও জানিয়েছে, আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলা বন্ধ রাখবে তারা। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌ চলাচল ও জ্বালানি খাতে সাময়িক স্বস্তি ফিরেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি মাসে ইরান ও ওমানের জলসীমায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে আগে থেকে থাকা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিও ভেঙে যায়।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে সৌদি জাহাজে হামলা চালায়।
সংঘাত তীব্র হওয়ার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। গত সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা মে মাসের পর প্রথমবার। তবে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকার খবর প্রকাশের পর শুক্রবার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত এবং হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির বিষয়ে ইরানের দাবিতে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা এবং দুই দেশের সার্বভৌম অধিকার রক্ষার বিষয়ে কিছু সাধারণ নীতি ও কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এদিকে চীনের উদ্যোগে শুরু হওয়া কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরুর বিষয়টি পাকিস্তান বিবেচনা করছে বলেও একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমে এলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও কিছুটা কমবে। ন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ব্যাংকের স্যালি অউল্ড বলেন, সপ্তাহান্তে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ইতিবাচক দিকে এগিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠলে দুই পক্ষের উত্তেজনা কমানোর প্রবণতা আরও জোরালো হতে পারে বলে ধারণা তৈরি হয়েছে।
তেলের দামে পতনের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে যাওয়া এবং নতুন করে সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা কিছুটা কমায় বেশিরভাগ শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের যৌক্তিকতা ও এ খাতের বর্তমান উত্থান কতটা টেকসই—এ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে আবারও বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাংয়ের শেয়ারে বিক্রির চাপ দেখা যায়। তাইপে ও সিঙ্গাপুরের বাজারও কমেছে। ইন্দোনেশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পেরি ওয়ারজিও ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করায় জাকার্তার বাজারেও পতন দেখা গেছে।
অন্যদিকে টোকিওর শেয়ারবাজার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাডভানটেস্ট, কিওক্সিয়া ও টোকিও ইলেকট্রনের শেয়ারে বিক্রির চাপ অব্যাহত ছিল। হংকং, সিডনি, সাংহাই, ওয়েলিংটন ও ম্যানিলার বাজারও ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
চলতি সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে এসকে হাইনিক্স, স্যামসাং ও জাপানের কিওক্সিয়ার আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের দিকে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট, মেটা, অ্যাপল ও অ্যামাজনের আর্থিক প্রতিবেদনও গুরুত্ব পাবে। এসব প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ ব্যয়ের বিষয়েও নজর রাখবেন বিনিয়োগকারীরা।
কেসিএম ট্রেডের টিম ওয়াটারার বলেন, প্রযুক্তি খাতে বিপুল মূলধনী ব্যয়ের পরিমাণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনো উদ্বেগ রয়েছে। এসব বিনিয়োগ থেকে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পেতে কত সময় লাগবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রভাব এবং মূল্যস্ফীতি কমার সাম্প্রতিক তথ্যের মধ্যে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী মুদ্রানীতি সিদ্ধান্তের দিকেও নজর রয়েছে বাজারের।
অ্যালিয়াঞ্জ গ্লোবাল ইনভেস্টরসের জেনি জেং মনে করেন, জুলাইয়ে নীতিনির্ধারণী বোর্ড সম্ভবত মুদ্রানীতির অবস্থান অপরিবর্তিত রাখবে। তবে বছরের শেষ নাগাদ সুদের হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়তে পারে বলে তারা এখনো ধারণা করছেন।
এদিকে চীনের শীর্ষ মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিএক্সএমটি সাংহাই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রথম দিনেই প্রায় ৪৭০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি দেখেছে। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য চীনের বৃহত্তম ব্যাংক আইসিবিসিকেও ছাড়িয়ে যায়।
ব্লুমবার্গ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনহুইভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিক শেয়ার বিক্রি বা আইপিওর মাধ্যমে ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। চীনের মূল ভূখণ্ডে কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে এটি সবচেয়ে বড় আইপিও।