স্টাফ রিপোর্টার:
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এর রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট থেকে বদলি হয়ে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এ যোগদানের পর তিনি জ্যেষ্ঠতা ও প্রচলিত প্রশাসনিক নিয়মের তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন তদবিরের মাধ্যমে কমিশনারেটের গুরুত্বপূর্ণ ‘হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তা’র দায়িত্ব বাগিয়ে নেন। এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধাভোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফাইল আটকে রাখা, অডিট কার্যক্রমে শিথিলতা দেখানো, শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার এবং বন্ড লাইসেন্স সংক্রান্ত জটিলতাকে কেন্দ্র করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগের আরও গুরুতর দিক হলো, এই অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এ যোগদানের পর বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেন। অডিট, শোকজ নোটিশ, বন্ড লাইসেন্সের নবায়ন ও বিভিন্ন প্রশাসনিক অনুমোদনের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করে পরে সমঝোতার মাধ্যমে তা নিষ্পত্তির অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসের কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে প্রতি মাসে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকারি দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে ঘুষ ও আর্থিক সুবিধাকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে তা শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও বেশ গুরুতর। অভিযোগে বলা হয়েছে, তার স্ত্রী সানজিদা আফরিন লিপির নামে রাজধানীর ভাটারা মৌজায় বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিতে লিপির স্থায়ী ঠিকানা খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকায় উল্লেখ রয়েছে এবং তাকে গৃহিণী হিসেবে জানা গেলেও তার নামে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিপুল মূল্যের সম্পত্তি থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৭৫৬(IX-I) নম্বর নামজারি মামলার মাধ্যমে ভাটারা মৌজার জেএল নম্বর ১৫, নামজারি খতিয়ান নম্বর ২৯৭১৬ এবং দাগ নম্বর ২০৭৬৩-সংক্রান্ত সম্পত্তি তার নামে নেওয়া হয় বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়ের অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়কর নথির সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সম্পত্তির পরিমাণ নিয়েও সরকারি নথিপত্রে বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, মূল নামজারি খতিয়ানে জমির পরিমাণ ০.৪০০০ একর বা প্রায় ৪০ শতাংশ হিসেবে উল্লেখ থাকলেও ডিজিটাল ভূমি রেকর্ডে একই সম্পত্তির পরিমাণ ৪.৯৬ একর দেখানো হয়েছে। দুই নথিতে জমির পরিমাণের এমন পার্থক্য কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের হিসাব অনুযায়ী, ভাটারা এলাকায় বর্তমান বাজারদর কাঠাপ্রতি প্রায় ৬০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত হলে ৪০ শতাংশ জমির আনুমানিক বাজারমূল্য কয়েক কোটি থেকে কয়েক দশ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে ডিজিটাল রেকর্ডে যদি ৪.৯৬ একর জমির তথ্য সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে এর বাজারমূল্য আরও অনেক বেশি হতে পারে। তবে জমির প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা ও বাজারমূল্য ভূমি অফিস, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগ রয়েছে, শুধু রাজধানীর ভাটারা এলাকাতেই নয়, স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামেও খুলনার সোনাডাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। এসব সম্পদের অর্থের উৎস কী, কখন এবং কীভাবে সম্পদগুলো অর্জিত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে একজন সরকারি কর্মকর্তার ঘোষিত আয়, আয়কর রিটার্ন এবং তার পরিবারের নামে থাকা সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটি যাচাই করা হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পখাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট শর্তে শুল্ক ও কর সুবিধা পেয়ে থাকে। ফলে বন্ড কমিশনারেটের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ, ফাইল আটকে রাখা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের বিষয় থাকে না; এর সঙ্গে দেশের রাজস্ব আদায়, রপ্তানি খাত এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশও জড়িত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিশনারেটের একজন সাবেক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ পদে থেকে কোনো ধরনের সংঘবদ্ধ অনিয়ম হলে তার প্রভাব পুরো কমিশনারেটের কার্যক্রমে পড়তে পারে। তবে ওই কর্মকর্তার বক্তব্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ, বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের কাছে বিভিন্ন কাজ নিয়ে গেলে ফাইলের অগ্রগতি নিয়ে নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাদের দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে অঘোষিত আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চাপ তৈরি করা হয়। এ কারণে কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পান না বলেও দাবি করেছেন তারা। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট সব নথি, ফাইল নোটিং, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য যাচাই করলে এসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব।
বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মহল। তাদের দাবি, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমেই তা পরিষ্কার করা উচিত। একই সঙ্গে তার ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণ এবং সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস যাচাই করার দাবি উঠেছে। পাশাপাশি ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেন, বন্ড সুবিধা সংক্রান্ত ফাইল, অডিট প্রতিবেদন এবং বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের স্বাক্ষরিত নথি ও ফাইল নোটিং পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে একতরফা বক্তব্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে না গিয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগের সত্যতা না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থানও স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে। ফলে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এর এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।