স্টাফ রিপোর্টার:
আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ‘বালিশ কাণ্ড’-এ অভিযুক্ত ঠিকাদার শাহাদাত হোসেনকে ঘিরে আবারও নতুন করে নানা অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় একাধিক ঠিকাদারের দাবি, পাবনা জেলায় বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজের ক্ষেত্রে এখনও তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং শাহাদাত হোসেনের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, বর্তমানে পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রায় ৫১২ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজেও শাহাদাত হোসেনের প্রভাব রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের টেন্ডার অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে হলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব তার ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে পাবনা সদরের বিভিন্ন সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ প্রকল্পেও তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাবনা জেলার একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করতে গেলে প্রভাবশালী একটি মহলের অনুমতি ছাড়া এগোনো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের ভাষ্য, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করে একটি সিন্ডিকেট কাজ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
একজন ঠিকাদার বলেন,
“সরকারি যেকোনো বড় প্রকল্পে অংশ নিতে গেলে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত ঠিকাদার কাজ পেলেও বাস্তবে অন্যদের মাধ্যমে কাজ পরিচালিত হয়।”
অন্য একজন ঠিকাদার অভিযোগ করে বলেন,
“প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি বিপুল অর্থের মাধ্যমে বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব খাটান বলে আমরা মনে করি। ফলে সাধারণ ঠিকাদাররা সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ বা শাহাদাত হোসেনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রূপপুরের ‘বালিশ কাণ্ড’ কী?
২০১৯ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে আসবাবপত্র ক্রয় এবং পরিবহন ব্যয় নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, একটি বালিশের মূল্য প্রায় ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা এবং সেটি ভবনের ফ্ল্যাটে তুলতে আরও ৭৬০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছিল। একইভাবে একটি চুলা কিনতে ৭ হাজার ৭৪৭ টাকা এবং তা বহন করতে ৬ হাজার ৬৫০ টাকা, একটি ইস্ত্রি কিনতে ৪ হাজার ১৫৪ টাকা এবং বহন ব্যয় ২ হাজার ৯৪৫ টাকা দেখানো হয়।
এসব ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা নিয়ে দেশব্যাপী সমালোচনা শুরু হলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্তে নামে। তদন্তের পর প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রকৌশলী, কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়।
শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
দুদকের মামলার নথি অনুযায়ী, শাহাদাত হোসেন রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ান কর্মকর্তাদের আবাসন নির্মাণে যুক্ত শীর্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের মালিক। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, আসবাবপত্র সরবরাহে অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে প্রায় ১৬ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
এই অভিযোগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি কারাগারে যান।
২০২০ সালে জামিনে মুক্তি
পরবর্তীতে ২০২০ সালের ২৭ আগস্ট পাবনা জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে শাহাদাত হোসেন জামিন লাভ করেন। আদালতের আদেশের পর গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
তৎকালীন দুদক পাবনা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, আদালতের আদেশ হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
নতুন অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, আলোচিত দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার পরও শাহাদাত হোসেনের প্রভাব কমেনি। বরং এখনও পাবনার বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের উন্নয়ন প্রকল্প, হাসপাতাল নির্মাণ, সড়ক ও ড্রেন নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের ঘোষণা দেয়নি। একইভাবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে শাহাদাত হোসেন বা তার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিকভাবে উত্থাপিত পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫১২ কোটি টাকার প্রকল্পসহ অন্যান্য কাজ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগগুলো অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে। এগুলোর সত্যতা আদালত বা কোনো সরকারি তদন্ত সংস্থা দ্বারা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করলে প্রকৃত তথ্য সামনে আসবে।