মোঃআনজার শাহ
দেশের সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিতকরণ, চাঁদাবাজির অভিযোগ থেকে সংগঠনকে মুক্ত রাখা এবং আধুনিক, নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ জাতীয় সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নবনির্বাচিত কমিটির নেতা খোন্দকার মোহাম্মদ মোরতাজুল করিম বাদরু। তিনি বলেন, শ্রমিকের অধিকার রক্ষা ও পরিবহন খাতের বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা দূর করতে মালিক, শ্রমিক, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ জাতীয় সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নবনির্বাচিত ও অনুমোদিত কমিটির পরিচিতি সভায় বক্তব্য দেন তিনি। সভায় সভাপতিত্ব করেন ফেডারেশনের সভাপতি নাজিম উদ্দিন আলম। অনুষ্ঠানে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রাজুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ফেডারেশনের নতুন নেতৃত্বের মধ্যে নাজিম উদ্দিন আলম সভাপতি, মোরতাজুল করিম বাদরু কার্যকরী সভাপতি এবং রেজাউল ইসলাম রাজু সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।
বক্তব্যের শুরুতে বাদরু তাঁর রাজনৈতিক গুরু নাজিম উদ্দিন আলমের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ছাত্ররাজনীতির স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ছাত্রদলের রাজনীতির মধ্য দিয়ে তাঁদের রাজনৈতিক পথচলা গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ফেডারেশনের অনুমোদিত কমিটির প্রথম পরিচিতি সভা সংগঠনের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা, সমস্যা ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়েই আগামী দিনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে চান তাঁরা।
ফেডারেশনের প্রবীণ নেতাদের অবদান স্মরণ করে বাদরু বলেন, সংগঠনের অনেক নেতা দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় পরিশ্রম করেছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও ত্যাগকে যথাযথ মূল্যায়ন করেই নতুন কমিটিকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, “আপনারা আমাদের ভাই হিসেবে গ্রহণ করবেন। অভিভাবক মনে করার প্রয়োজন নেই। আমরা আপনাদের কাছ থেকে শিখে, আপনাদের অভিজ্ঞতা ও সমস্যাগুলো জেনে এই সংগঠনকে এগিয়ে নিতে চাই।”
তাঁর মতে, শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বের মূল দায়িত্ব হলো শ্রমিকদের পাশে থাকা, তাঁদের ন্যায্য দাবি তুলে ধরা এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ তৈরি করা। প্রবীণ ও নবীন নেতৃত্বের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও ঐক্য বজায় থাকলে শ্রমিকদের স্বার্থে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে বাদরু বলেন, শ্রমিক সংগঠনের পরিচয় কোনোভাবেই চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত নয়। শ্রমিকদের আয় ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে নিয়মতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে।
তাঁর মতে, পরিবহন শ্রমিকদের নির্ধারিত ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা গেলে সড়কে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা কমার সুযোগ তৈরি হবে। যাত্রী থাকুক বা না থাকুক, শ্রমিকদের বেতনব্যবস্থা নির্ধারিত ও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। এতে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় এক বাসের সঙ্গে অন্য বাসের পাল্লা দেওয়া এবং বেপরোয়া গাড়ি চালানোর প্রবণতা কমতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করা এবং পরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা পরস্পর সম্পর্কিত। তাই শ্রমিকের অধিকার ও জননিরাপত্তাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নয়, বরং সমন্বিতভাবে উভয় লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে হবে।
ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অদক্ষ চালকের বিরুদ্ধে অবস্থান
সড়ক পরিবহনের নিরাপত্তা ও আধুনিকায়নে গুরুত্বারোপ করে বাদরু বলেন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের মান, চালকদের দক্ষতা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ, চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত, মাদকমুক্ত কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা এবং সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সময়ের দাবি। প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছাড়া কাউকে গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয় বলেও তিনি মত দেন।
তিনি আরও বলেন, পরিবহন খাতকে আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব করতে হলে গাড়ির মান উন্নয়নের পাশাপাশি চালকদের পেশাগত দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু শ্রমিকদের ওপর দায় চাপিয়ে নয়; পরিবহনমালিক, শ্রমিক সংগঠন, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
বাদরু বলেন, দেশের সড়ক পরিবহনব্যবস্থায় স্থায়ী শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয় জরুরি। ফেডারেশনের সভাপতি নাজিম উদ্দিন আলম ও সাধারণ সম্পাদক রাজুর নেতৃত্বে সংগঠনকে আরও সক্রিয় করে শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবহন খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, যাত্রীদের নিরাপত্তা, যানবাহনের ফিটনেস, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে।
পরিবহন খাতে দীর্ঘদিনের মাফিয়াভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, নৈরাজ্য ও চাঁদাবাজির অবসান ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আহ্বানও জানানো হয়েছে; এ ক্ষেত্রে নতুন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃত্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
পরিচিতি সভার বক্তব্যে বাদরু অতীতের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন কমিটিকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। দীর্ঘদিন ধরে ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সংগঠনকে আরও সুসংগঠিত করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন নেতৃত্ব শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়, পরিবহন খাতের অনিয়ম প্রতিরোধ এবং নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।
তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শ্রমিকের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি, সাংগঠনিক ঐক্য এবং আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। নিরাপদ সড়ক ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবহনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে ফেডারেশনের নতুন কমিটি কাজ করবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন খোন্দকার মোহাম্মদ মোরতাজুল করিম বাদরু।