আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কর্মসূচি, ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ এবং তাঁর প্রশাসনিক জীবনের পুরোনো কিছু ঘটনা নিয়ে সমালোচনা করছেন বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীরা। তবে এসব অভিযোগের সবকটির সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্য নেই।
জ্ঞানেশ কুমারের জন্ম ১৯৬৪ সালের ২৭ জানুয়ারি ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায়। তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮৮ সালে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবায় (আইএএস) যোগ দেন। কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি কেরালাসহ ভারতের বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৬ সালে তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন জম্মু ও কাশ্মীরবিষয়ক বিভাগে দায়িত্ব পান। পরবর্তী সময়ে অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রমেও দায়িত্ব পালন করেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে আলোচনার একটি বিষয় কেরালার সাবেক মুখ্যসচিব জিজি থমসনের অভিযোগ। এনডিটিভির ২০২৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, থমসন দাবি করেছেন, ২০১৬ সালে দিল্লিগামী একটি বিমানে কথোপকথনের সময় জ্ঞানেশ কুমার তাঁকে বিজেপির হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
থমসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কেরালার পাথানামথিট্টা আসন থেকে বিজেপির প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনে জয়ী হলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে জ্ঞানেশ কুমারের বক্তব্য জানা যায়নি।
পুরোনো ঘুষের অভিযোগ
জ্ঞানেশ কুমারের প্রশাসনিক জীবনের একটি পুরোনো ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৬ সালে তিনি কেরালা সরকারের গণপূর্ত বিভাগের সচিব ছিলেন। সে সময় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত কেরালা স্টেট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের একটি সড়ক উন্নয়ন কাজ নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও রাজ্য সরকারের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।
প্রকল্পের কাজের বিল, ব্যয় বৃদ্ধি ও জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব নিয়ে বিরোধের মধ্যে প্রকল্পটির প্রধান ব্যবস্থাপক, মালয়েশীয় প্রকৌশলী লি সি বিন আত্মহত্যা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ঘুষ দাবির অভিযোগ সামনে আসে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর রেখে যাওয়া বলে দাবি করা একটি নোটে প্রকল্পের বিল ছাড় করাতে সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দাবির অভিযোগ ছিল এবং সেখানে জ্ঞানেশ কুমারের নামও উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে কোনো নোটে নাম থাকার দাবি নিজে থেকেই অপরাধ প্রমাণ করে না। এ ঘটনায় অভিযোগের চূড়ান্ত তদন্তের ফল বা আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া জ্ঞানেশ কুমারকে দুর্নীতির জন্য দায়ী করা যায় না।
রাম মন্দিরের অনুদান নিয়ে বিতর্ক
২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অযোধ্যা-সংক্রান্ত রায়ের পর রাম মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ এগিয়ে যায়। এ-সংক্রান্ত প্রশাসনিক দায়িত্বে জ্ঞানেশ কুমার যুক্ত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্দির নির্মাণের জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত অনুদানের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি ট্রাস্টের বিরুদ্ধে কয়েকশ কোটি রুপি আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার কথাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ অভিযোগের সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমারের নাম জড়ালেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি, ব্যক্তিগত ভূমিকা এবং কোনো তদন্ত বা বিচারিক সিদ্ধান্তের তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন নিয়ে বিরোধ
জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের বড় অংশ নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কর্মসূচি। এ প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধন করা হচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ায় যোগ্য নাগরিকদের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এবং এতে বিজেপি রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন রাজ্যে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ভোটার, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত ভোটার এবং প্রায় ৩ কোটি এমন ভোটার রয়েছেন, যাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিরোধীদের বক্তব্য, এত বড় পরিসরে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ভুল হলে প্রকৃত ভোটাররা তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারেন। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের সংশোধনপ্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ও বাস্তবায়ন মূল্যায়নে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা, আপত্তি নিষ্পত্তি এবং বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগের তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা, নিবন্ধন পদ্ধতি ও নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়ে জ্ঞানেশ কুমারের দুই ডেপুটি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪টি আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন। এসব আপত্তির বিষয়বস্তু, কমিশনের জবাব এবং সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করলে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
বিতর্কের মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার
জ্ঞানেশ কুমার ভারতের দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন কর্মকর্তা, যিনি বর্তমানে দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর কর্মজীবন নিয়ে আলোচনায় যেমন প্রশাসনিক দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত উঠে এসেছে, তেমনি বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধও সামনে এসেছে।
তবে অভিযোগ, রাজনৈতিক সমালোচনা এবং প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, স্বাধীন তদন্তের ফল, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য এবং আদালতের সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা জরুরি। একইভাবে, এসআইআর কর্মসূচির প্রভাব মূল্যায়নে বাদ পড়া নামের সংখ্যা ছাড়াও যোগ্য ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত থাকছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।